বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ

বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং রপ্তানিকারক ও প্রবাসী আয়ের সঙ্গে যুক্তদের আস্থা পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংক সক্রিয় হস্তক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। সাম্প্রতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে আরও ১৪১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে, যা বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিনিময় হারকে নিয়ন্ত্রিত ও পূর্বানুমেয় পর্যায়ে রাখার দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) ১৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অংশগ্রহণে আয়োজিত একটি কাঠামোবদ্ধ নিলামের মাধ্যমে এ ডলার ক্রয় সম্পন্ন হয়। নিলামে প্রতি ডলারের দর ছিল খুবই সংকীর্ণ পরিসরে—১২২ টাকা ২৯ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৩০ পয়সার মধ্যে। কাটা দর নির্ধারণ করা হয় ১২২ টাকা ৩০ পয়সায়। এত কম দরের ব্যবধান থেকেই বোঝা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং হঠাৎ বড় ধরনের পরিবর্তনের বদলে ধাপে ধাপে ও পরিমিত সমন্বয়ের পথ অনুসরণ করছে।

এই নিলামটি ‘মাল্টিপল প্রাইস অকশন (এমপিএ)’ পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, যেখানে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো নির্ধারিত সীমার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন দরে দরপত্র জমা দিতে পারে। এ পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো স্বচ্ছতা বাড়ানো, বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণকে উৎসাহ দেওয়া এবং জল্পনা বা কৃত্রিম কারসাজির সুযোগ কমিয়ে আনা। নিয়মতান্ত্রিক ও কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের প্রতি অংশীজনদের আস্থা আরও সুদৃঢ় করতে চায়।

এর আগেও একই সপ্তাহে, ১১ ডিসেম্বর সোমবার, বাংলাদেশ ব্যাংক ১৬টি ব্যাংক থেকে ১৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছিল। সে সময় ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা ২৫ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ২৯ পয়সার মধ্যে, আর কাটা দর নির্ধারণ করা হয় ১২২ টাকা ২৯ পয়সায়। পরপর দুটি নিলামে দরের এই ঘনিষ্ঠ সামঞ্জস্য স্পষ্ট করে যে কর্তৃপক্ষ হঠাৎ দরপতন বা অস্বাভাবিক উল্লম্ফন ঠেকিয়ে টাকার মানকে স্থিতিশীল রাখতেই গুরুত্ব দিচ্ছে।

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ১৩ জুলাই থেকে নিলামভিত্তিক ডলার ক্রয় ব্যবস্থা চালুর পর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এ নীতির মূল লক্ষ্য হলো পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য নিশ্চিত করা, বৈধ আমদানি পরিশোধে সহায়তা করা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও দেশের বহিঃখাতকে সুরক্ষিত রাখা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহ বজায় রাখা চলতি হিসাবে ভারসাম্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরাসরি ডলার কিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করছে, তেমনি বাজারে একটি স্পষ্ট বার্তাও দিচ্ছে—বিনিময় হার থাকবে নিয়ন্ত্রিত ও স্থিতিশীল। এতে একদিকে হঠাৎ টাকার অবমূল্যায়ন বা অতিমূল্যায়নের ঝুঁকি কমে, অন্যদিকে প্রবাসীদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহ বাড়ে।

বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী মাসগুলোতেও বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনভিত্তিক ও পরিমিত হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখবে। দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিলামের পরিমাণ ও সময় নির্ধারণ করা হবে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা।