শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই হামলার মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদকে ঘিরে যে তথ্যগুলো সামনে আসছে, তাতে স্পষ্ট হচ্ছে—ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো সহিংসতা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি জটিল নেটওয়ার্কের বহিঃপ্রকাশ।
ফয়সাল করিম নিজেকে একসময় প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ২০১০ সালে তিনি ‘অ্যাপল সফট আইটি লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ওয়েব ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন উন্নয়নে কাজ করত। পরবর্তীতে তিনি ‘ওয়াইসিইউ টেকনোলজি লিমিটেড’-এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘ব্যাটল অব ৭১’ নামের একটি কম্পিউটার গেম তৈরি করেন, যা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছিল। এই পরিচয়ের আড়ালেই ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা গড়ে ওঠে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নথি অনুযায়ী, ফয়সাল করিম ২০২৩ সালের একটি বড় ডাকাতি মামলার প্রধান আসামি ছিলেন। ঢাকার আদাবরে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অফিসে অস্ত্রের মুখে ১৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করেছিল র্যাব। সে সময় তার কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, গুলি ও একাধিক মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। এরপর জামিনে বেরিয়ে এসে তিনি আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
তদন্তকারীরা বলছেন, ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও হামলার কৌশল ফয়সালের পূর্ব অপরাধ ইতিহাসের সঙ্গে মিল রয়েছে। হামলার সময় মোটরসাইকেলে এসে খুব কাছ থেকে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার কৌশল ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ফয়সালের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ছবি ও যোগাযোগের তথ্য। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে তাকে সাবেক রাষ্ট্রপতি, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে দেখা গেছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ওসমান হাদির সঙ্গে গণসংযোগে অংশ নেওয়ার ছবিও তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে—তিনি কি কেবল একজন অনুসারী ছিলেন, নাকি ভেতরে ভেতরে অন্য উদ্দেশ্য কাজ করছিল?
গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, একটি বড় ইসলামি দলের কিছু নেতার সঙ্গে তার যোগাযোগ রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে। এই সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে মামলাটি নতুন মোড় নেবে এবং জাতীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে ওসমান হাদি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি কাটেনি। তদন্তকারীরা বলছেন, এই হামলার পেছনের মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের চিহ্নিত না করা পর্যন্ত মামলার তদন্ত শেষ হবে না।
এই ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে—রাজনীতি, অর্থ ও অপরাধ যখন একসূত্রে গাঁথা হয়, তখন গণতন্ত্র ও জননিরাপত্তা কতটা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
