সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের জন্য উৎসাহ বোনাস প্রদানের পৃথক নীতিমালা কার্যকর হওয়ায় দেশের আর্থিক খাতে একটি স্পষ্ট বৈষম্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। যেখানে সরকারি ব্যাংকগুলো লোকসানের মধ্যেও বিশেষ অনুমোদনে কর্মীদের বোনাস দিতে পারবে, সেখানে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য আরোপ করা হয়েছে কঠোর ও প্রায় অনমনীয় শর্ত। এর ফলে ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কেবল প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী নিট মুনাফা অর্জন করলেই বেসরকারি ব্যাংকগুলো উৎসাহ বোনাস দিতে পারবে। পুঞ্জীভূত বা পূর্ববর্তী বছরের মুনাফা থেকে কোনো ধরনের বোনাস দেওয়ার সুযোগ সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি শ্রেণীকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং সামগ্রিক ব্যাংকিং সূচকের বাস্তব উন্নতি থাকতে হবে।
এই নির্দেশনার ফলে বর্তমানে যেসব ব্যাংক বছর শেষ হওয়ার পরদিনই উৎসাহ বোনাস দিয়ে থাকে, সেই চর্চা কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। অতীতে কিছু ব্যাংক বিভিন্ন হিসাবি ছাড় ও সমন্বয়ের মাধ্যমে মুনাফা দেখিয়ে কর্মীদের বোনাস প্রদান করলেও, নতুন নিয়মে সেই পথও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, সরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকায় একটি নমনীয় অবস্থান দেখা যাচ্ছে। সেখানে বলা হয়েছে, পরিচালন মুনাফা থেকে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সমন্বয়ের পর নিট মুনাফা নির্ধারণ করতে হবে। তবে প্রয়োজনে মন্ত্রণালয় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে একটি বোনাস প্রদানের দাবি বিবেচনা করতে পারবে। এই বিধান ২০২৪ সালের উৎসাহ বোনাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাস্তবে অনেক সরকারি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে লোকসান ও মূলধন ঘাটতির মধ্যেই চলছে। তবুও সেখানে বোনাস প্রদানের সুযোগ রাখা হয়েছে। অথচ তুলনামূলক ভালো পরিচালন কাঠামো থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কর্মীরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতিমালার ফলে হাতে গোনা কয়েকটি শক্তিশালী বেসরকারি ব্যাংক ছাড়া অন্যরা উৎসাহ বোনাস দিতে পারবে না। এতে করে কর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়বে এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎসাহ বোনাস শুধু আর্থিক প্রণোদনাই নয়, বরং এটি কর্মীদের স্বীকৃতি ও কর্মপ্রেরণার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে ভারসাম্য ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল—যা বর্তমান কাঠামোয় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।
