স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের গতিবিধিতে সম্প্রতি এক অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে—যখনই কেউ তাদের অতীত ভূমিকা বা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে, বিশেষ করে ‘রাজাকার’ হিসেবে অভিযুক্ত করে, তখনই তারা দ্রুত দাবি করে বসে—“আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান।” কথাটি শুনতে যতই দৃঢ় মনে হোক, বাস্তবে এর ভেতর লুকিয়ে আছে এক ধরনের কৌশলগত দায় এড়ানোর চেষ্টা। কারণ, এ ধরনের দাবি করা হলেও সাধারণত তারা কখনোই স্পষ্ট করে বলতে চান না—ওই পরিবারে আসলেই কে যুদ্ধ করেছিলেন?
প্রশ্নটি সরল: পরিবারের কোন সদস্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন?
– বাবা?
– বড় ভাই?
– দাদা?
– নাকি নানা?
এ প্রশ্ন উঠলেই অনেকেই বিষয়টি এড়িয়ে যান, প্রসঙ্গ বদলানোর চেষ্টা করেন কিংবা আবেগের দেয়াল তুলে মূল প্রশ্নটিকে আড়াল করতে চান। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ তো আজকাল মায়ের খালু, বাবার ফুপা, দূর সম্পর্কের আত্মীয়—সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের তালিকায় ফেলে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে ঢাকার চেষ্টা করেন।
কিন্তু এতে বাস্তবতা বদলায় না। কারণ, দেশের মানুষ খুব ভালোই বোঝে—মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় কোনো ঢাল নয়; এটি একটি গৌরবময় অধিকার, যা ইতিহাসের সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই পরিচয়ে ভর করে কেউ নিজের অতীত বা বর্তমান ভূমিকা লুকাতে চাইলে তা শেষ পর্যন্ত উল্টো প্রতিক্রিয়াই ডেকে আনে।
মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে অস্পষ্ট দাবির ধরন
| দাবির ধরণ | উদ্দেশ্য | বাস্তবতা |
|---|---|---|
| “আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান” | প্রাথমিক আক্রমণ প্রতিহত করা | পরিবারে কে যুদ্ধ করেছেন স্পষ্ট নয় |
| দূর সম্পর্কের আত্মীয় দেখানো | পরিচয়কে শক্তিশালী দেখানো | সাধারণত যাচাইযোগ্য তথ্য নয় |
| প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া | অতীত ভূমিকা গোপন করা | সন্দেহ আরও বাড়ায় |
| আবেগ দেখানো | সমালোচনা ঠেকানো | তথ্যহীন হলে কার্যকর নয় |
মুক্তিযুদ্ধে কার অবদান কতটা—এ নিয়ে জোর করে গল্প বানানোর চেষ্টা করলে তা অনিবার্যভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ে। ইতিহাসের সত্যকে আড়াল করা যায় না, কারণ, শাক দিয়ে তো আর মাছ ঢাকা যায় না।
সমাজে ও রাজনীতিতে আজও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি নানা ছলচাতুরী করে নিজেদের অবস্থানকে ঢাকার চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষকে বিভ্রান্ত করা যতটা সহজ ভাবা হয়, সত্য প্রকাশিত হওয়ার পথ তার চেয়েও অনেক শক্তিশালী।
এ বিষয়ে সাংবাদিক ও বিশ্লেষক আনিস আলমগীর বলেন, মিথ্যা পরিচয় দিয়ে নিজের মান বা অবস্থান বাড়ানো যায় না; মানুষের কাজই শেষ পর্যন্ত বলে দেয় তিনি কোন পক্ষের, কোন আদর্শের। তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করে বা তাতে জোর করে নিজেদের জায়গা তৈরি করা অনৈতিকই নয়—দেশের প্রতি অবমাননাও।
সত্যের সামনে দাঁড়ানোর সাহসই শেষ কথা। আর সেই সত্য হচ্ছে—মুক্তিযুদ্ধ ছিল জাতির সম্মিলিত লড়াই; এর গৌরব নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা নয়, সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব।