মোহাম্মদপুরে নৃশংস জোড়া খুনে প্রশিক্ষিত ঘাতকের সন্দেহ

মোহাম্মদপুরে মা–মেয়ের নৃশংস হত্যা: প্রশিক্ষিত ঘাতক নাকি উন্মত্ত সাইকোপ্যাথ—দ্বিধায় তদন্তকারীরা

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডের একটি বাসায় মা লায়লা আফরোজ ও মেয়ে নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিজ—দুইজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনায় পুলিশও হতভম্ব। ঘটনাস্থলের বর্ণনা, লাশের সুরতহাল ও আঘাতের গভীরতা দেখে তদন্তকারীরা প্রাথমিকভাবে দুটি সম্ভাবনার কথা বলছেন—ঘাতক হয় প্রশিক্ষিত কিলার, নতুবা অতিরিক্ত ক্ষোভে উন্মত্ত কোনো সাইকোপ্যাথ
সোমবার সংঘটিত এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মোটিভ এখনও পরিষ্কার নয়; তবে পুলিশ বলছে, সাধারণ মানুষের জন্য এমন নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করা “প্রায় অসম্ভব”।


লোমহর্ষক সুরতহাল: একটির পর একটি গভীর আঘাত

সুরতহালে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য—
মা লায়লা আফরোজের শরীরে কমপক্ষে ৩০টি জখমের চিহ্ন।
গভীর ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতবিক্ষত।

লায়লা আফরোজের শরীরের আঘাত–তথ্য

শরীরের অংশআঘাতের সংখ্যা
বাম গাল৩টি
থুতনি৪টি
গলার নিচে৫টি
বাম হাত৩টি
দুই হাতের কব্জি৩টি
বুকে (বাম পাশ)৯টি
পেটের বাম পাশে২টি
তলপেটে১টি

অন্যদিকে, মেয়ে নাফিসার শরীরেও গলা, বুকের দু’পাশসহ ৬টি গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তকারী সূত্রের নিশ্চিতকরণ অনুযায়ী, দুজনেরই মৃত্যু হয়েছে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে
সোমবার রাতেই ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।


অস্ত্র উদ্ধার—যার ব্যবহারেই পুলিশের সন্দেহ ঘনীভূত

ঘटनাস্থল থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে দুটি অস্ত্র—
১. একটি সাধারণ সবজি কাটার ছুরি
২. একটি বিশেষ ধরনের ‘সুইচ গিয়ার’

এই সুইচ গিয়ার আঙুলের ফাঁকে শক্তভাবে আটকে ব্যবহার করা যায়, যাতে আঘাত করার সময় অস্ত্র হাত থেকে না পড়ে।
তদন্তকারীরা বলছেন—এই ধরনের অস্ত্র বাসাবাড়িতে সাধারণত থাকে না; ফলে ধারণা মিলছে, ঘাতক পরিকল্পিতভাবেই অস্ত্র সঙ্গে এনেছিল

পুলিশের মতে, অস্ত্র ব্যবহারের ধরন এতটাই পেশাদার ও নিখুঁত যে ঘাতক হয় সুশিক্ষিত, নয়তো মনোবিকারগ্রস্ত কোনো সাইকোপ্যাথ, যে চরম ক্ষোভ বা প্রতিশোধ থেকে উন্মত্তভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।


হত্যার পর ঘাতকের ‘ঠান্ডা মাথার’ আচরণ

ঘটনায় তদন্তকারীদের সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে হত্যার পর ঘাতকের আচরণ।
তথ্য অনুযায়ী—

  • হত্যা শেষে সে বাথরুমে গিয়ে গোসল করে,

  • নিজের রক্তমাখা পোশাক পরিবর্তন করে,

  • এবং নিহত মেয়ের স্কুল ড্রেস পরে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়।

এ ঘটনায় কথিত গৃহকর্মী আয়েশাকে আসামি করে মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। তিনি এখনো পলাতক।


সিসি ক্যামেরায় নজরদারি—ঘাতকের গতিবিধির সন্ধান

তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান জানান—
“হত্যার ধরন ও নৃশংসতা দেখে মনে হচ্ছে ঘাতক প্রশিক্ষিত। সিসি ক্যামেরার সব ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। হত্যার আগে–পরে সন্দেহভাজন কী করেছে, কোথায় গিয়েছে—সব খতিয়ে দেখছি।”

ঘাতক যে মেয়ের স্কুল ড্রেস পরে পালিয়েছে, তাও পুলিশের কাছে ইঙ্গিত দিচ্ছে—এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে।

পুলিশের আশা—পলাতক গৃহকর্মীকে গ্রেপ্তার করতে পারলেই এই নৃশংস জোড়া খুনের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হবে।


নাটোরে মা–মেয়ের দাফন সম্পন্ন

আজ (মঙ্গলবার) বাদ জোহর নাটোর শহরের গাড়ীখানা কবরস্থানে মা–মেয়ের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
এর আগে নবাব সিরাজ–উদ–দৌলা সরকারি কলেজ মাঠে জানাজায় অংশ নেন পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং স্থানীয় মানুষজন।


সমগ্র বিশ্লেষণ

মোহাম্মদপুরের এ হত্যাকাণ্ড শুধু নৃশংসতার কারণেই নয়, হত্যার পর ঘাতকের ঠান্ডা মাথার আচরণ ও অস্ত্র ব্যবহারের ধরণে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তদন্তকারীদের সামনে তাই দুটি প্রশ্ন—
এ কি প্রশিক্ষিত খুনি? নাকি উন্মত্ত সাইকোপ্যাথের প্রতিশোধ?

রাজধানীর সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে এখন অপেক্ষা কেবল পলাতক সন্দেহভাজনের গ্রেপ্তার।