বিপ্লবী প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী: বগুড়ার অগ্নিসন্তানের অনন্য স্মৃতি

বাংলার বিপ্লবী ইতিহাসে বহু নাম আলোচিত হলেও এক বিস্ময়কর যোদ্ধার নাম বারবার আড়ালে পড়ে যায়—বগুড়ার সূর্যসন্তান বিপ্লবী প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী। ১৮৮৮ সালের ১০ ডিসেম্বর বগুড়া জেলার শিবগঞ্জের বিহারহাটে জন্ম নেওয়া এই অগ্নিমূর্তি স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিলেন কৈশোরেই। ব্রিটিশ শাসনের অবিচার, দমননীতি ও উপনিবেশিক নিষ্ঠুরতা তাঁকে ধীরে ধীরে ঠেলে দিয়েছিল সশস্ত্র বিপ্লবের পথে।

বিপ্লবী জীবনের সূচনা

কৈশোরে বিভিন্ন গোপন বিপ্লবী দলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। আলেখ্য মতে, অল্প বয়সেই তিনি বোমা তৈরির কৌশল ও গোপন সাংগঠনিক কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন। তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, অসাধারণ সাহস ও সংগঠনের প্রতি অটল নিষ্ঠা তাঁকে দ্রুত নেতাদের আস্থাভাজন বানিয়ে তোলে।

কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করে ঐতিহাসিক অভিযান

বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত অভিযানের অন্যতম নায়ক ছিলেন প্রফুল্ল চাকী। ইংরেজ বিচারক কিংসফোর্ডের দমননীতি এবং বিপ্লবীদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের প্রতিশোধ নিতে পরিকল্পনা করা হয় বোমা হামলা। যদিও ইতিহাসে ক্ষুদিরাম বসুর নাম বেশি উচ্চারিত হয়, কিন্তু পরিকল্পনার মূল কারিগর, সমন্বয়ক ও সামগ্রিক কৌশল রচয়িতা ছিলেন প্রফুল্ল চাকী।

১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল মুজফ্ফরপুরের কাছে কোর্ট কারেজে নিক্ষিপ্ত সেই বোমা অভিযান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। ক্ষুদিরাম গ্রেফতার হয়ে পরবর্তীতে ফাঁসির দণ্ড পান। অন্যদিকে, প্রফুল্ল চাকী ব্রিটিশ পুলিশের অবরোধ থেকে মুক্তি পেতে নিজের রিভলভার দিয়ে আত্মোৎসর্গ করেন। এমন আত্মহুতির দৃষ্টান্ত ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।

ভুলে যাওয়া বীরের বেদনাবিধুর বাস্তবতা

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য—বাংলার বিপ্লবী ইতিহাসে ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন কিংবা প্রীতিলতার মতো নায়কদের নাম আলোয় থাকলেও প্রফুল্ল চাকীর অবদান যথাযোগ্য মর্যাদা পায়নি। তাঁর জন্মভিটায় নেই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের স্মৃতিসৌধ, নেই জাদুঘর কিংবা গবেষণার উদ্যোগ। কেবল একটি বেসরকারি সংগঠন “প্রফুল্ল চাকী পরিষদ” তাঁর স্মৃতি ধরে রাখতে লড়ছে নীরবে।

অন্যদিকে, কলকাতায় শিয়ালদা স্টেশন সংলগ্ন একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে “প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী সার্কুলার রোড”—কিন্তু নিজের জন্মভূমি বগুড়ায় সে সম্মান নেই। একসময় ভান্ডারি বালিকা বিদ্যালয়ের পিছনে তাঁর নামে একটি সড়ক ছিল বলে জানা গেলেও এখন আর তা সুস্পষ্টভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই অবহেলা কেবল একজন বীরকে বিস্মৃত করার উদাহরণ নয়, বরং ইতিহাসের প্রতি জাতির দায়হীনতার প্রতীক।

জন্মদিনে শ্রদ্ধা

আজ ১০ ডিসেম্বর—বিপ্লবী প্রফুল্ল চন্দ্র চাকীর জন্মদিনে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি তাঁর অতুলনীয় আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার প্রতি অদম্য নিষ্ঠাকে। মাতৃভূমির জন্য জীবন বিসর্জন দিতে যিনি এক মুহূর্ত দ্বিধা করেননি, তিনি আমাদের চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।
লাল সালাম অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীকে।