লুকিয়ে রাখা অর্থ ব্যাংকে জমা দেওয়ায় বাড়ছে কোটিপতির সংখ্যা

দেশে কোটিপতি ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে, আর এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে অনেক মানুষের বাড়িতে লুকিয়ে রাখা বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ ব্যাংকে জমা দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়াকে দেখছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন।

অর্থ উপদেষ্টা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি, মূল্যস্ফীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় অনেকেই নিরাপদ আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ফিরে যেতে শুরু করেছেন। আগে যেসব কারণে মানুষ ঘরে নগদ অর্থ সঞ্চয় করে রাখতেন—তা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন তারা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনছেন এবং বড় অঙ্কের টাকা ব্যাংকে জমা দিচ্ছেন। এর ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই উচ্চ অঙ্কের আমানত বাড়ছে এবং কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনও একই চিত্র তুলে ধরে। ব্যাংকের তথ্যানুসারে, বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে কোটি টাকা বা তারও বেশি জমা রয়েছে—এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে হিসাব সংখ্যা এক লাখ ২৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এটি দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে নতুন মাইলফলক।

খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম আর্থিক চাপে রয়েছে। সংসারের ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে অনেকেই আগের সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন। ফলে ছোট অঙ্কের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কমছে। কিন্তু ধনী শ্রেণির আয় ও সম্পদ বাড়তে থাকায় বড় অঙ্কের আমানত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও সম্পদশালীদের আয় বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, আর কোটিপতি হিসাব বৃদ্ধিই তার প্রমাণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, কোটিপতি হিসাব দেখলেই তা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদের পরিচায়ক নয়। কারণ এই তালিকায় বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বড় করপোরেট হিসাবও অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অসংখ্য ব্যাংক হিসাব খুলতে পারেন—সেই হিসেবে একজনের একাধিক কোটিপতি হিসাব থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়।

সাম্প্রতিক ব্যাংকিং পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৪৫ লাখ ৯৬ হাজার ৭০০টি। চলতি বছরের জুন শেষে এই সংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯০ লাখ ২ হাজার ৬৭১টি। মাত্র তিন মাসে ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৫৫ লাখ ৯৪ হাজার ২৯টি, যা ব্যাংকিং খাতে গ্রাহক বৃদ্ধির শক্তিশালী প্রবণতা নির্দেশ করে।

জুন প্রান্তিকে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৩৬টি। সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৭০টিতে। তিন মাসে বাড়তির সংখ্যা ৭৩৪টি।

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন বলেন, দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং, নিরাপদ লেনদেন ব্যবস্থা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং হিসাব ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ মানুষের আস্থা বাড়িয়েছে। ফলে ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার প্রবণতা বেড়েছে এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তার মতে, নগদ অর্থ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং খাতে ফিরে আসা অর্থনৈতিক প্রবাহকে আরও গতিশীল করবে।