বাংলা গানের দীর্ঘ যাত্রায় এমন কিছু গান আছে, যেগুলো সময়কে অতিক্রম করে আজও শ্রোতাদের আবেগ জাগায়। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ থেকে আশির দশকের সেসব গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে আছে মূলত তাদের অনবদ্য কথার শক্তির জন্য। এই সব স্মরণীয় সৃষ্টির পেছনে ছিলেন এক নিরব নক্ষত্র—গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, যার কলমের প্রতিটি শব্দ ছিল অনুভূতির এক অনুপম চিত্রকল্প।
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিশটি বাংলা গানের মধ্যে তার লেখা দুটি গান—‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা’ এবং ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি’। তার সাহিত্যপ্রেম ও ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যয়নই তাকে পরিণত করেছিল এক সংবেদনশীল কবিতে। কলেজজীবনে কালীদাসের মেঘদূত ইংরেজিতে অনুবাদ করে তিনি বুঝিয়েছিলেন তার ভাষাজ্ঞানের গভীরতা।
তার প্রথম সাফল্য আসে অগ্নিপরীক্ষা (১৯৫৪) ছবির জন্য লেখা গানগুলোর মাধ্যমে। সেই সময় অনুপম ঘটকের সুরে ‘কে তুমি আমারে ডাকো’ বা ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’—প্রতিটি গানেই ছিল কবিতার মোলায়েম ছোঁয়া। শচীন দেববর্মণের উৎসাহে তিনি তৈরি করেন আরও বহু কালজয়ী সৃষ্টি, যেমন ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই’, যেখানে তিনি আবেগকে চমৎকার শব্দচিত্রে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
নচিকেতা ঘোষের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব বাংলা গানের ভুবনে এক বিশেষ অধ্যায়ের জন্ম দেয়। দু’জনে মিলে তৈরি করেন বহু গান—যেমন ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই’, ‘সূর্য ডোবার পালা’, ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’ প্রভৃতি। প্রতিটি গানে তার অনন্য শব্দচয়ন, প্রেমের ব্যথা, বিচ্ছেদের আকুলতা কিংবা রোমান্স—সবই তাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
তিনি লিখেছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, রাহুল দেব বর্মণ ও বাপ্পী লাহিড়ীর জন্যও বহু গান। ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, ‘এই রাত তোমার আমার’, ‘সেদিনও আকাশে ছিলো কত তারা’—এসব গান তার সৃষ্টিশীলতা ও ভাষাবোধের সৌন্দর্যকে অমর করেছে। কিশোর কুমারের বাড়িতে বসে একটি ঝরেপড়া ফুল দেখে তিনি ‘সেদিনও আকাশে’ গানের পুরো কথাই ধারায় লিখে ফেলেছিলেন—এটিই তার কবি-হৃদয়ের পরিচয়।
অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি ও চিরদিনের—এই দুই ছবির জন্য লেখা গানও তাকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যায়। ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’, ‘মানুষ খুন হলে পরে’—এসব গান তার সামাজিক চেতনা এবং রোমান্টিকতার মিশ্রণকে স্পষ্ট করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অতি দ্রুত লিখেছিলেন ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে’, যা তিনি লেখেন একটি সিগারেটের প্যাকেটে। আবার জীবনের শেষ সময়ে ক্যান্সারে আক্রান্ত অবস্থায় রচনা করেন ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা’—যা বাংলা গানের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
১৯২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর পাবনার গোপালনগরে জন্ম নেওয়া এই গীতিকবি আজ জন্মশতবার্ষিকীতে স্মরণীয় ও অম্লান।
