কান্দাহারে গোলাগুলিতে চার আফগান নিহত, সীমান্তে উত্তেজনা

আফগানিস্তান–পাকিস্তান সীমান্তে নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহার প্রদেশের স্পিন বোলডাক জেলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও আফগান বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলিতে অন্তত চারজন আফগান নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আরও চারজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আফগান গণমাধ্যম টোলো নিউজ। এই ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা আরও গভীর হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছোড়া মর্টার শেলের আঘাতে স্পিন বোলডাক জেলার মাজাল গালি ও লুকমান গ্রামে হতাহতের ঘটনা ঘটে। নিহত ও আহতদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক বলে দাবি করা হচ্ছে। আহতদের মধ্যে একজন নারী ও একজন পুরুষের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁদের কান্দাহারের আইনো মিনা হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তী সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী প্রথমে আফগান ভূখণ্ডে গোলাবর্ষণ শুরু করে। এর জবাবে আফগান বাহিনী পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাঁর দাবি, আফগান বাহিনী কেবল আত্মরক্ষামূলক অবস্থান থেকেই জবাব দিয়েছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রভাবশালী পত্রিকা ডন জানিয়েছে, বেলুচিস্তানের চামান সীমান্তে শুক্রবার গভীর রাতে দুই দেশের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি হয়। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের দাবি, আফগান বাহিনী প্রথমে মর্টার শেল নিক্ষেপ করে, যা পাকিস্তানি সীমান্ত এলাকায় আঘাত হানে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাল্টা গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়। পাকিস্তান পক্ষ এই ঘটনাকে স্পষ্ট আগ্রাসন হিসেবে বর্ণনা করেছে।

ডনের প্রতিবেদনে কোয়েটার এক সিনিয়র প্রশাসনিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, সংঘর্ষটি শুক্রবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে শুরু হয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে। সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।

চামান জেলা হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট মুহাম্মদ ওয়াইস জানিয়েছেন, সংঘর্ষের পর আহত তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন নারী রয়েছেন। আহতদের অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ নতুন কিছু নয়। গত কয়েক মাস ধরেই স্পিন বোলডাক–চামান সীমান্ত এলাকায় পাল্টাপাল্টি হামলা, গোলাগুলি ও কূটনৈতিক উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, চেকপোস্ট নির্মাণ এবং যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ রয়েছে। এসব ঘটনার ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বর্তমানে তলানিতে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ মানুষই এই উত্তেজনার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। নিয়মিত সংঘর্ষের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে এই পরিস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক বার্তা দিচ্ছে।

নিচে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ সংক্রান্ত প্রধান তথ্যগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

বিষয়তথ্য
সংঘর্ষের স্থানস্পিন বোলডাক জেলা, কান্দাহার, আফগানিস্তান
সংশ্লিষ্ট এলাকামাজাল গালি ও লুকমান গ্রাম
ঘটনার সময়শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত
নিহতঅন্তত ৪ জন আফগান নাগরিক
আহত৪ জন (এক নারীসহ)
আহতদের চিকিৎসাআইনো মিনা হাসপাতাল, কান্দাহার
অপর সীমান্ত এলাকাচামান, বেলুচিস্তান
উভয় পক্ষের দাবিএকে অপরকে হামলার জন্য দায়ী

সব মিলিয়ে, এই সর্বশেষ সংঘর্ষ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কূটনৈতিক সমাধান ও সীমান্তে সংযম না এলে ভবিষ্যতে আরও প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুই দেশের দায়িত্বশীল ভূমিকা এখন সময়ের দাবি—এমন মতই জোরালো হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলে।