চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ইজারা চুক্তি বাতিলের দাবিতে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের যুক্ত আন্দোলন শুক্রবার চট্টগ্রাম নগরের সাগরিকা শিল্পাঞ্চলে নতুন মাত্রা পায়। চট্টগ্রাম শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) উদ্যোগে আয়োজিত শ্রমিক জনসভা ও মশাল মিছিল শ্রমিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিত্রিত হয়েছে।
সন্ধ্যায় শুরু হওয়া এই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগের সাধারণ সম্পাদক এবং বন্দর সিবিএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন টিইউসি কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক ফজলুল কবির মিন্টু। সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা সভাপতি ও শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য তপন দত্ত, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বন্দর-সম্পর্কিত নীতি পরিবর্তনের বিরোধিতা করে আসছেন।
Table of Contents
⚓ বন্দরের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব: শ্রমিকদের উদ্বেগ
তপন দত্ত তাঁর বক্তব্যে বলেন—চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি লজিস্টিক স্থাপনা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। তাই এনসিটি ইজারা বা লালদিয়ার চর-পানগাঁও ইজারা চুক্তিকে তিনি “জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র” বলে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন,
“একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের বন্দর ইজারা দেওয়ার নৈতিক বা আইনগত কোনো ক্ষমতা নেই। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দরের সুবিধা তুলে দিলে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।”
শ্রমিক সংগঠনগুলোর উদ্বেগের কারণ হলো—ইজারা কার্যকর হলে হাজার হাজার বন্দরের শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, একই সঙ্গে বিদেশি কোম্পানির হাতে কৌশলগত স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
🔥 মশাল মিছিল: শ্রমিক ক্ষোভের প্রতীক
সমাবেশ শেষে সাগরিকা শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভকারীরা মশাল হাতে কর্মসূচি পালন করেন। শ্রমিকদের মতে, ‘মশাল’ প্রতিরোধের প্রতীক; এটি দেখায় যে তারা তাদের অধিকার, কর্মসংস্থান ও সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষায় আপসহীন।
সমাবেশে উপস্থিত নেতাদের মধ্যে ছিলেন—
এসকে খোদা তোতন, সভাপতি, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশন
মছিউদ দৌলা, সাধারণ সম্পাদক, টিইউসি চট্টগ্রাম
শ ম জামাল উদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল
কাজী আনোয়ারুল হক হুনি, সভাপতি, বিএফটিইউসি চট্টগ্রাম
হেলাল উদ্দিন কবির, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট
আবু আহমেদ মিয়া, সাধারণ সম্পাদক, বিএলএফ
জাহেদ উদ্দিন শাহীন, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন
তসলিম হোসেন সেলিম, ডক শ্রমিক দল
ইব্রাহীম খোকন, সাধারণ সম্পাদক, বন্দর শ্রমিক দল
শ্রমিক নেতারা বলেন, ইজারা প্রক্রিয়াটি দ্রুত বন্ধ না হলে দেশব্যাপী কঠোর আন্দোলনে যাওয়া হবে।
🇧🇩 ডিসেম্বরের প্রেক্ষাপট: জাতীয় আবেগকে সামনে আনলেন নেতারা
তপন দত্ত তাঁর বক্তৃতায় ডিসেম্বরকে বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলেন—
“এ মাস বিজয়ের মাস। এই মাসে শ্রমিকের রক্ত ঝরানো হয়েছে ইজারা চুক্তির বিরুদ্ধে। এর প্রতিদান কড়ায়-গণ্ডায় দিতে হবে।”
শ্রমিক নেতারা দাবি করেন, বিজয়ের মাসে জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন আরও তীব্র হবে।
🚩 নতুন কর্মসূচি ঘোষণা
সমাবেশ থেকে ঘোষণা করা হয়—
আগামী ১০ ডিসেম্বর দেওয়ানহাট মোড় থেকে বন্দর অভিমুখে লাল পতাকা গণমিছিল।
এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলো তাদের আন্দোলন আরও জোরদার করবে বলে জানায়।
🔎 সামগ্রিক বিশ্লেষণ
এই আন্দোলন শুধুমাত্র ইজারা চুক্তির বিরোধিতা নয়—
এটি বন্দরের ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে জড়িত।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের কৌশলগত সম্পদ হওয়ায় এর ইজারা প্রশ্নটি রাজনৈতিক ও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে—
বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর পরিচালনার অধিকার দেওয়া হলে দেশের বাণিজ্য স্বায়ত্তশাসনে প্রভাব পড়তে পারে
শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক অস্থিতিশীল হবে
দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে
এসব কারণে শ্রমিকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই ইজারা চুক্তি নিয়ে সন্দেহ ও উদ্বেগ বাড়ছে।
