ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পশ্চিম সরলিয়া গ্রামে পারিবারিক সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক হৃদয়বিদারক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। বাবার মরদেহ নিজ ঘরে তুলতে অস্বীকৃতি জানান একমাত্র ছেলে মহসিন আলী। ফলে বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করা তসলিম উদ্দীন (৭০)–এর মরদেহ প্রায় ২৩ ঘণ্টা দাফন ছাড়াই পড়ে থাকে। ঘটনাটি এলাকায় চরম আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং পারিবারিক বিরোধের সামাজিক পরিণতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তসলিম উদ্দীন দীর্ঘদিন ধরে ছেলে মহসিন আলীর সঙ্গে বসবাস করতেন না। ছেলে তাঁর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ না করায় তিনি মেয়ের বাড়ি মহিষমারী গ্রামে আশ্রয় নেন। জীবনের শেষ সময়টায় মেয়েই বাবার চিকিৎসা, আহার ও দৈনন্দিন দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত রবিবার সন্ধ্যায় বার্ধক্যজনিত কারণে তসলিম উদ্দীনের মৃত্যু হয়। স্বাভাবিকভাবেই পরিবার ও আত্মীয়স্বজন জানাজার প্রস্তুতি নিতে উদ্যোগী হন।
রাতে মরদেহ নিজ বাড়িতে আনা হলে ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। একমাত্র ছেলে মহসিন আলী মরদেহ ঘরে তুলতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর অভিযোগ, তসলিম উদ্দীন জীবদ্দশায় মেয়েদের নামে সম্পত্তি লিখে দিয়েছেন, যা তিনি মেনে নিতে পারেননি। এ কারণে তিনি বাবার মৃত্যুকে ‘সন্দেহজনক’ আখ্যা দিয়ে থানায় অভিযোগও করেন। তবে স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রগুলো বলছে, মৃত্যুর আগে তসলিম উদ্দীন দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন এবং মৃত্যুর সময় কোনো অস্বাভাবিকতার প্রমাণ মেলেনি।
ছেলের অস্বীকৃতির কারণে মরদেহটি রাতভর বাড়ির ভেতরে রাখা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতির চাপে আত্মীয়স্বজন মরদেহটি পাশের এক ভাইয়ের বাড়ির বারান্দায় রাখতে বাধ্য হন। এতে পরিবারে শোকের পরিবেশের পাশাপাশি বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা বিষয়টি জানার পর মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুত সমাধানের দাবি জানান।
পরদিন সোমবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিকেল ৪টার দিকে থানা পুলিশের সহযোগিতায় পারিবারিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার মীমাংসা হয়। পরে জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এবং মরদেহ দাফন সম্পন্ন করা হয়। দীর্ঘ ২৩ ঘণ্টা পর শেষ পর্যন্ত তসলিম উদ্দীন তাঁর প্রাপ্য ধর্মীয় মর্যাদা পান।
দুওসুও ইউনিয়নের ইউপি সদস্য হবিবুর রহমান জানান, “সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ থেকেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমরা সবাই বসে আলোচনা করেছি। শেষ পর্যন্ত পরিবার সম্মত হওয়ায় দাফনে আর কোনো বাধা থাকেনি।” তিনি আরও বলেন, পারিবারিক কলহ যেন এমন অমানবিক পরিস্থিতিতে না গড়ায়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
এ বিষয়ে বালিয়াডাঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুরুল হুদা বলেন, “এটি মূলত পারিবারিক বিষয়। প্রাথমিক তদন্তে মৃত্যুর ঘটনায় কোনো সন্দেহজনক আলামত পাওয়া যায়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও আপত্তি না থাকায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।” তিনি শান্তিপূর্ণ সমাধানে স্থানীয়দের সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন।
ঘটনাটির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরতে নিচের টেবিলটি দেওয়া হলো—
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| মৃত ব্যক্তির নাম | তসলিম উদ্দীন |
| বয়স | ৭০ বছর |
| মৃত্যু原因 | বার্ধক্যজনিত |
| স্থান | পশ্চিম সরলিয়া গ্রাম, বালিয়াডাঙ্গী |
| বিরোধের কারণ | সম্পত্তি বণ্টন |
| দাফনে বিলম্ব | প্রায় ২৩ ঘণ্টা |
| সমাধান | স্থানীয় ও পুলিশের মধ্যস্থতা |
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ কেবল সম্পর্কের অবনতি ঘটায় না, মানবিক মূল্যবোধকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। স্থানীয়দের মতে, জীবিত অবস্থায় পারিবারিক সমঝোতা ও দায়িত্ববোধ থাকলে এমন করুণ পরিস্থিতির জন্ম হতো না। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ আশা করছেন, এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিবারগুলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীলতার পথে ফিরে আসবে।
