২০২৫ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশ্ব অর্থনীতিতে যে গভীর অভিঘাত সৃষ্টি করেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এশিয়া। বৈশ্বিক পুনর্বীমা শিল্পের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ওই বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল একাই বহন করেছে প্রায় ৭৩ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি, যা বৈশ্বিক মোট ক্ষতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। গত এক দশকে এ অঞ্চলের গড় বার্ষিক ক্ষতি যেখানে প্রায় ৬৬ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২৫ সালকে স্বাভাবিকের তুলনায় ব্যতিক্রমী ও অতিমাত্রায় ব্যয়বহুল বছর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই ক্ষতির মাত্রাকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে আর্থিক সুরক্ষার ঘাটতি। এশিয়ায় ৭৩ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির বিপরীতে বিমাকৃত ক্ষতির পরিমাণ ছিল মাত্র প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষতিই সরাসরি বহন করতে হয়েছে পরিবার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং সরকারি কোষাগারকে। বহু স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশে বিমা কভারেজ এখনো ৫ শতাংশের নিচে। এর ফলে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠন দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে, দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ে, সরকারি ঋণের চাপ বৃদ্ধি পায় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশ্বব্যাপী চিত্রেও ২০২৫ সালে ঝুঁকির ধরনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। আগের বছরের তুলনায় মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি কিছুটা কমলেও বিমাকৃত ক্ষতি কমেনি; বরং তা বেড়ে প্রায় ১০৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি টানা আরেকটি বছর, যখন বিমাকৃত দুর্যোগ ক্ষতি ১০০ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। এই প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে ক্ষতিকর ঘটনার সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বিমাকৃত সম্পদের ঝুঁকিও ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে।
ক্ষতির প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আবহাওয়াজনিত দুর্যোগই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি। মোট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রায় ৯২ শতাংশ এবং বিমাকৃত ক্ষতির আনুমানিক ৯৭ শতাংশই এসেছে বন্যা, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, বজ্রঝড় ও শিলাবৃষ্টির মতো ঘটনাগুলো থেকে। কোনো একক মহাবিপর্যয়ের বদলে বারবার ও বিস্তৃত এলাকায় সংঘটিত এসব চরম আবহাওয়ার সমষ্টিগত প্রভাবই বছরটির ক্ষতির চিত্র নির্ধারণ করেছে।
এশিয়ায় বিশেষভাবে কয়েকটি বড় ঘটনা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। মিয়ানমারের শক্তিশালী ভূমিকম্প, একাধিক দেশে বিস্তৃত মৌসুমি বন্যা, চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভয়াবহ প্লাবন এবং উত্তর ভারত মহাসাগরের একটি ঘূর্ণিঝড় শ্রীলঙ্কা ও ভারতের অংশবিশেষে ব্যাপক মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনে। এসব ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিমা সুরক্ষা ছিল সীমিত, যা অঞ্চলের সুরক্ষা ঘাটতিকে আরও স্পষ্ট করেছে।
মানবিক ক্ষতিও ছিল গভীর। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় ১৭ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল জরুরি ত্রাণের ওপর নির্ভরতা এই সংকট মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতা গড়ে তুলতে উন্নত ঝুঁকি পূর্বাভাস, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বিমা ও ঝুঁকি ভাগাভাগির সুযোগ সম্প্রসারণ অপরিহার্য।
২০২৫ সালের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্ষতির সারসংক্ষেপ
| সূচক | বৈশ্বিক মোট | এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগর |
|---|---|---|
| মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি | ২২৪ বিলিয়ন ডলার | ৭৩ বিলিয়ন ডলার |
| বিমাকৃত ক্ষতি | ১০৮ বিলিয়ন ডলার | ৯ বিলিয়ন ডলার |
| আবহাওয়াজনিত ক্ষতির অংশ | ৯২ শতাংশ | প্রধান অংশ |
| আনুমানিক প্রাণহানি | প্রায় ১৭,০০০ | উল্লেখযোগ্য অংশ |
