বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে কিছু গান সময়ের সীমা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে ওঠে। সুর, কণ্ঠ আর কথার সম্মিলনে যে আবেগ জন্ম নেয়, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে চলে। তেমনই এক অবিস্মরণীয় গানের পঙ্ক্তি— “আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়, তবু কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়”—আজও শ্রোতার মনে গভীর অনুরণন তোলে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে সুবীর নন্দীর দরদি কণ্ঠে গানটি প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা দেশজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই কালজয়ী পঙ্ক্তির স্রষ্টা কবি ও গীতিকার জাহিদুল হক বাংলা গীতিকবিতায় সংবেদনশীলতা, বেদনা ও মানবিক অনুভবের এক উজ্জ্বল নাম।
জাহিদুল হকের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সূচনা হয় ষাটের দশকের শেষভাগে। কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও গণমাধ্যম—সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন স্বতন্ত্র ও দৃঢ় স্বাক্ষর। তাঁর লেখায় ব্যক্তিগত বেদনা যেমন আছে, তেমনি আছে সমাজ, সময় ও মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। সহজ শব্দে গভীর অনুভূতি প্রকাশ করার যে ক্ষমতা, তা তাঁকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১১ আগস্ট ১৯৪৯ সালে, আসামের বদরপুরে। তাঁর পিতা ডা. নূরুল হক ভুঞা সে সময় বদরপুর রেলওয়ে হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। পিতামাতা উভয় দিক থেকেই তিনি ছিলেন এক শিক্ষিত, অথচ ধীরে ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত পরিবারের সন্তান। এই পারিবারিক পটভূমি তাঁর মানসিক গঠন ও সৃজনশীলতার গভীরতায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। পিতার বদলির চাকরির কারণে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দেশের নানা অঞ্চলে। ফলে বিভিন্ন স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে তিনি ছোটবেলা থেকেই বৈচিত্র্যময় জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ফেনী কলেজে অধ্যয়ন শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর শিকড় প্রোথিত কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আকদিয়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ভূঞা বাড়িতে, যা বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে বিশেষভাবে পরিচিত। এই ঐতিহ্য ও শেকড়ের টান তাঁর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে নানা রূপে।
কর্মজীবনে জাহিদুল হক ছিলেন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি জার্মানির কোলোন থেকে সম্প্রচারিত আন্তর্জাতিক বেতার কেন্দ্র রেডিও ডয়েচে ভেলে-তে দীর্ঘদিন সিনিয়র এডিটর ও ব্রডকাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশের প্রাচীন জাতীয় দৈনিক ‘সংবাদ’-এ তিনি কাজ করেছেন সিনিয়র সহকারী সম্পাদক হিসেবে। এছাড়া বাংলাদেশ বেতার-এ উপ-মহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) পদে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর সৃজনশীল পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক দক্ষতা সমানভাবে প্রশংসিত হয়।
কবিতা ও গীতিকবিতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি লাভ করেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। সংগীত বিভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সম্মাননাসহ দেশ-বিদেশের বহু পুরস্কার ও স্বীকৃতি তাঁর ঝুলিতে যুক্ত হয়। তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমির সম্মানিত ফেলো। ইউরোপ ও এশিয়ার বহু ঐতিহাসিক নগরীতে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাভাবনা ও সৃষ্টিকে করেছে আরও পরিণত ও বহুমাত্রিক।
২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি, দ্বিপ্রহরে, ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলা কবিতা, গান ও গণমাধ্যম হারিয়েছে এক সংবেদনশীল শিল্পী, মননশীল বুদ্ধিজীবী ও নীরব সাধককে।
নিচের ছকে সংক্ষেপে তাঁর জীবন ও কর্মের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্ম | ১১ আগস্ট ১৯৪৯, বদরপুর, আসাম |
| শিক্ষা | ফেনী কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় |
| পেশা | কবি, গীতিকার, সাংবাদিক, সম্প্রচারক |
| উল্লেখযোগ্য গান | “আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়” |
| কর্মক্ষেত্র | রেডিও ডয়েচে ভেলে, দৈনিক সংবাদ, বাংলাদেশ বেতার |
| পুরস্কার | বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার |
| মৃত্যু | ১৫ জানুয়ারি ২০২৪, ঢাকা |
জাহিদুল হক আজ নেই, কিন্তু তাঁর লেখা গান, কবিতা ও শব্দেরা আমাদের অনুভূতিতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে নয়—বরং প্রতিদিন আরও গভীর হয়ে বেঁচে থাকে।
