খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুলাই ২০২৬, ৪:৫১ পিএম

দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত চার মাসের বেশি সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে কিংবা এ ধরনের উপসর্গ নিয়ে মোট ৭৯৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ৮০০ মৃত্যুর মাইলফলক থেকে এখন ব্যবধান মাত্র তিনজনের।
মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে অসুস্থ হয়েছে ১ হাজার ৮ শিশু। তাদের মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ১৩০ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া চার শিশুর মধ্যে দুজন সিলেট বিভাগের, একজন রাজশাহী বিভাগের এবং অন্যজন ময়মনসিংহ বিভাগের। ফলে দেশের একাধিক অঞ্চলে হাম ও হামের মতো উপসর্গ নিয়ে শিশুদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এতে পরিস্থিতির ভৌগোলিক বিস্তৃতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৫৬ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে হামে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৭০৮ শিশু। অর্থাৎ, আক্রান্তদের একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত না হলেও তারা হামের মতো উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিপুল সংখ্যক উপসর্গযুক্ত শিশুও পরিস্থিতির ব্যাপকতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যাও এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ের মধ্যে মোট ১ লাখ ২ হাজার ২৪৪ শিশু এসব উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯৮ হাজার ৪১১ শিশু। এর অর্থ, বিপুলসংখ্যক শিশু চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠলেও এখনও অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে অথবা রোগের জটিলতার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ার বিষয়টিও পরিস্থিতির তীব্রতা তুলে ধরছে। গত ২৬ জুন হাম ও হামের উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে ৭০২ জনে পৌঁছেছিল। এরপর মাত্র ২৬ দিনের ব্যবধানে সেই সংখ্যা বেড়ে ৭৯৭ হয়েছে। অর্থাৎ, এই সময়ের মধ্যে আরও ৯৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর এমন ধারাবাহিক বৃদ্ধি শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের নিঃসৃত ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দেওয়া এ রোগের পরিচিত লক্ষণ। তবে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর আকার ধারণ করলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশু বা যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসা দেওয়া এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি হাম প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতা বাড়ানো এবং যেসব শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর, সর্দি-কাশি ও শরীরে র্যাশ দেখা দিলে অভিভাবকদের শিশুকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে শিশুর শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, পানিশূন্যতার লক্ষণ বা খাবার গ্রহণে অক্ষমতার মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন। সময়মতো চিকিৎসা জটিলতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চার মাসের বেশি সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজার ছাড়ানো এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৮০০-এর কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করছে। একই সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি ও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার বিপুল সংখ্যাও দেখাচ্ছে যে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান জোরদার, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং গুরুতর আক্রান্ত শিশুদের সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করাই পরিস্থিতি মোকাবিলার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য