হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তকরণে ইরানের প্রস্তাব এবং ট্রাম্পের দাবি: উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল, ২০২৬) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প এই দাবি করেন। একই সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে একগুচ্ছ বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন তিনি। অন্যদিকে, ইরানের এই পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা করেছে রাশিয়া।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি ও ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বার্তায় দাবি করেছেন যে, ইরান বর্তমানে এক চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি লিখেছেন, ইরান বর্তমানে ‘ধসে পড়েছে’ এবং দেশটিতে নেতৃত্বের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের প্রকৃত প্রধান নেতা কে, তা দেশটির নেতৃবৃন্দ নিজেরাই নিশ্চিত নন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইরান বর্তমানে তাদের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে। ট্রাম্প বিশ্বাস করেন তারা এতে সফল হবে, তবে সেই প্রক্রিয়া চলাকালীন তারা চায় যুক্তরাষ্ট্র যেন দ্রুততম সময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে সহযোগিতা করে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক অবরোধ নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী টানাপড়েন চলছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো অনুরোধের কথা এখনও স্বীকার করা হয়নি।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব ও বর্তমান সংকট

হরমুজ প্রণালি ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী একটি সংকীর্ণ সমুদ্রপথ, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির জন্য এই পথটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশ্বের মোট উৎপাদিত খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-তৃতীয়াংশ এই পথে পরিবাহিত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক অস্থিরতা ও সামরিক সংঘাতের জেরে এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। ইরান এই পথে নিরাপত্তা তল্লাশি ও জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছে যে, ইরান আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে মুক্ত বাণিজ্যের পথ রুদ্ধ করছে। অন্যদিকে, তেহরানের দাবি, তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে এবং অবৈধ বিদেশি হস্তক্ষেপ রুখতে তারা এই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বাধ্য।


রাশিয়ার সমর্থন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কর্মকাণ্ডের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ভাসিলি নেবেনজিয়া। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা করে তাদের বিরুদ্ধে ‘দস্যুতা’ ও ‘ভণ্ডামির’ অভিযোগ এনেছেন। নেবেনজিয়া মন্তব্য করেছেন যে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার পূর্ণ সার্বভৌম অধিকার ইরানের রয়েছে।

রুশ দূতের মতে, পশ্চিমা দেশগুলো সুপরিকল্পিতভাবে সব দোষ ইরানের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন ইরান অকারণে তার প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। নেবেনজিয়া আরও যুক্তি দেন যে, যুদ্ধের সময় কোনো উপকূলবর্তী দেশ যখন আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকে, তখন নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে সংলগ্ন জলসীমায় জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বৈধ। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর কর্মকাণ্ডকে দস্যুতার সঙ্গে তুলনা করে বলেন যে, তারা নিজেরাই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে অথচ ইরানের ওপর দায় চাপাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ গতিপথ

ট্রাম্পের এই দাবির পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরানের পক্ষ থেকে সত্যিই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়ে থাকে, তবে তা অঞ্চলটিতে বড় ধরনের কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত হতে পারে। তবে ট্রাম্পের এই দাবি তেহরানকে চাপের মুখে রাখার কোনো কৌশল কি না, তা নিয়েও জল্পনা চলছে।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, রাশিয়া এবং চীন—এই চতুর্মুখী শক্তির অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন মেরুতে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে ইরানকে কোণঠাসা করতে চাইছে, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন ইরানের সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়ে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরোধিতা করছে।

সংবাদের মূল সারাংশ:

  • মার্কিন দাবি: ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে এবং দেশটি রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত।

  • রুশ অবস্থান: ইরানের নিয়ন্ত্রণারোপকে বৈধ ও নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় বলে সমর্থন।

  • বৈশ্বিক প্রভাব: হরমুজ প্রণালি বন্ধ বা অনিয়ন্ত্রিত থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা।

এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও দাবির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন আন্তর্জাতিক মহলের গভীর পর্যবেক্ষণের বিষয়।


তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, ট্রুথ সোশ্যাল এবং জাতিসংঘ সদর দপ্তর।