,

হরমুজে জাহাজ চলাচলে বড় পতন, বাড়ছে নিরাপত্তা শঙ্কা

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যে তেলবাহী জাহাজে হামলা বাড়ার পর গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল দুই মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। গত সপ্তাহে জলপথটিতে ট্যাংকারে হামলার ঘটনা যুদ্ধ শুরুর পর যেকোনো সপ্তাহের তুলনায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পরই জাহাজ চলাচলে এই পতন দেখা যায়।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজ ও পণ্য পরিবহনের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপ্লারের হিসাবে, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র সাতটি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। গত ২৩ জুলাইয়ের পর এক দিনে এটিই সবচেয়ে কম জাহাজ চলাচলের ঘটনা।

৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কেপ্লারের বিশ্লেষক এমানুয়েল বেলোস্ত্রিনো ও ইউই তোরিকাতা জানান, যুদ্ধকালীন সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় আগের সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত তেল পরিবহন ২৭ শতাংশ কমেছে। ওই সময়ে প্রতিদিন অন্তত ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের হিসাবে, তেল পরিবহনের পরিমাণ এখন সেপ্টেম্বরে গড় সরবরাহের কাছাকাছি ফিরে এসেছে। তবে যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় তা ৭৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ সংঘাতের প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহনপথে কার্যক্রম এখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি।

কেপ্লারের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরবরাহ কমে যাওয়ার বড় অংশই ঘটেছে ওমান উপসাগরে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের ক্ষেত্রে। এই প্রক্রিয়ায় একটি ট্যাংকার থেকে সরাসরি অন্য ট্যাংকারে তেল স্থানান্তর করা হয়। নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে এ ধরনের কার্যক্রমও কমে যেতে পারে।

তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন কমলেও বিকল্প রুটে রপ্তানি বেড়েছে। ওমান উপসাগরের উপকূলীয় এলাকা ও লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি প্রতিদিন প্রায় ৬৭ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এই পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ দিয়ে সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাবের একটি বড় অংশ এই বাড়তি রপ্তানির মাধ্যমে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেলের মোট রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ের কাছাকাছি রাখা গেছে। অর্থাৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল কমলেও বিকল্প পথে সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে আঞ্চলিক রপ্তানি আপাতত ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।

জাহাজ চলাচলের হিসাবেও অস্থিরতার চিত্র স্পষ্ট। বুধবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে ১০টিতে দাঁড়ায়। কিন্তু রোববার ও সোমবার প্রতিদিন ২০টির বেশি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করেছিল। সেই তুলনায় বুধবারের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

গত দুই দিনে প্রণালিতে প্রবেশকারী জাহাজের সংখ্যা বেরিয়ে যাওয়া জাহাজের চেয়ে বেশি ছিল। এতে বোঝা যায়, জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিক প্রবাহে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবে এই তথ্য থেকে জাহাজগুলোর অবস্থান বা অপেক্ষার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

জাহাজ চলাচলের তথ্যের ক্ষেত্রে আরেকটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যেসব জাহাজ শনাক্ত হওয়া এড়াতে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা এআইএস বন্ধ করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট হিসাবের মধ্যে নেই। ফলে প্রকৃত জাহাজ চলাচলের সংখ্যা প্রকাশিত পরিসংখ্যানের চেয়ে কিছুটা বেশি হতে পারে।

সব জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী এলএসইজির হিসাবে, মঙ্গলবার মোট আটটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। এর মধ্যে চারটি প্রণালিতে প্রবেশ করেছে এবং চারটি বের হয়েছে। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১৪টি।

এলএসইজি জানায়, মঙ্গলবার চলাচল করা জাহাজগুলোর মধ্যে পাঁচটি ছিল তেলবাহী ট্যাংকার। ওই দিন ‘আল মাফইয়ার’ নামের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিবাহী জাহাজও প্রণালিতে ছিল। জাহাজটি কাতারের রাস লাফান থেকে গ্যাস নিয়ে পাকিস্তানের পোর্ট কাসিমের দিকে যাওয়ার কথা ছিল।

এদিকে, সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক হামলার কারণে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর যেকোনো সপ্তাহের তুলনায় সর্বোচ্চ ছিল। একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোও তেল রপ্তানি বাড়ানোর প্রচেষ্টা জোরদার করেছে।

সর্বশেষ ঘটনাগুলোর একটি ঘটে কাতারের মদিনাত আশ শামাল থেকে ৫১ নটিক্যাল মাইল উত্তরে। সেখানে একটি ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো উড়ন্ত বস্তু আঘাত হানে। এতে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। বুধবার যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা সংস্থা ঘটনাটি জানায়।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্বের কারণে জাহাজ চলাচলে এই পতন শুধু আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করত। এসব জাহাজের মধ্যে ছিল তেলবাহী ট্যাংকার, গ্যাসবাহী জাহাজ, বাল্ক কার্গো জাহাজ ও কনটেইনারবাহী জাহাজ।

এই জাহাজগুলোতে পরিবহন করা পণ্য বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমান ছিল। ফলে হরমুজে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি দীর্ঘস্থায়ী হলে জাহাজ চলাচল, জ্বালানি পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এখন পর্যন্ত বিকল্প রুটে তেল রপ্তানি বাড়িয়ে হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ট্যাংকারে হামলার ঘটনা বাড়তে থাকায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি যে দ্রুত বাড়ছে, সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচলের পরিসংখ্যানই তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।