দেশজুড়ে খুনসহ গুরুতর সহিংস অপরাধের হার সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জননিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারিবারিক বিরোধ, জমি সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত শত্রুতা এবং স্থানীয় গোষ্ঠীগত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একের পর এক প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রেই স্বজনদের হাতে স্বজন নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে, যা সামাজিক সম্পর্ক ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ইঙ্গিত বহন করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্তত পাঁচটি জেলায় মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে কমপক্ষে দশজন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে তিনটি রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। নওগাঁর নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। ফেনীর দাগনভূঞায় ছোট ভাইয়ের রডের আঘাতে বড় ভাই নিহত হন। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে পারিবারিক কলহের জেরে ছুরিকাঘাতে বড় ভাইয়ের মৃত্যু ঘটে। এসব ঘটনা সমাজে সহিংসতার মাত্রা ও পারিবারিক সম্পর্কের ভাঙনের চিত্র স্পষ্ট করে তুলছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন মাসে সারাদেশে মোট ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে ৩১৭টি হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আগের দুই বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা স্পষ্টভাবে বেশি, যা অপরাধ বৃদ্ধির ধারাবাহিক প্রবণতাকে নির্দেশ করে।
তিন বছরের হত্যাকাণ্ডের তুলনামূলক চিত্র
| বছর | জানুয়ারি | ফেব্রুয়ারি | মার্চ | মোট |
|---|---|---|---|---|
| ২০২৪ | ২৩১ | ২৪০ | ২৩৯ | ৭১০ |
| ২০২৫ | ২৯৪ | ২১৭ | ২৩৯ | ৭৫০ |
| ২০২৬ | ২৮৭ | ২৫০ | ৩১৭ | ৮৫৪ |
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা আগের দুই বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক অস্থিরতা, মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধ বৃদ্ধি এবং অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা এই পরিস্থিতির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।
গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন থানা ও নিরাপত্তা স্থাপনা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখনো এক হাজারের বেশি অস্ত্র এবং লক্ষাধিক গুলি উদ্ধার হয়নি বলে জানা যায়। এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে থাকায় সহিংস অপরাধের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে ঘটছে, যা সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গ্যাং সংঘর্ষ এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বারবার ঘটছে। কিছু এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালিত হলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি।
স্বরাষ্ট্র প্রশাসন সম্প্রতি চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র অপরাধে জড়িতদের তালিকা তৈরি করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া এই সহিংস পরিস্থিতি স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়।
সামগ্রিকভাবে পরিসংখ্যান ও ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে দেশে হত্যাকাণ্ডসহ গুরুতর সহিংস অপরাধের প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ জননিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
