জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

স্মৃতিতে অম্লান পপসম্রাট, জন্মবার্ষিকীতে মাইকেল জ্যাকসনকে শ্রদ্ধা

সংগীতের ইতিহাসে কিছু শিল্পীর নাম সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যায়। আবার কিছু মানুষ শিল্পী পরিচয়ের সীমা পেরিয়ে নিজেই হয়ে ওঠেন একটি যুগ, একটি সংস্কৃতি, একটি বৈশ্বিক প্রতীক। মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন সেই বিরল শিল্পীদের একজন। তাঁর কণ্ঠ, নৃত্য, মঞ্চপরিবেশনা, পোশাক, সংগীতচিত্র এবং শিল্পভাবনা মিলিয়ে তিনি এমন এক নিজস্ব জগৎ তৈরি করেছিলেন, যার প্রভাব আজও বিশ্বসংগীতে স্পষ্ট।

আজ ২৯ আগস্ট। ১৯৫৮ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গ্যারি শহরে জন্মেছিলেন মাইকেল জোসেফ জ্যাকসন। জীবনের পথ শেষ হয়েছে ২০০৯ সালে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির যাত্রা থামেনি। বরং সময় যত এগিয়েছে, তাঁর শিল্প তত বেশি কিংবদন্তির রূপ নিয়েছে।

শৈশবেই ভাইদের সঙ্গে ‘জ্যাকসন ফাইভ’ দলের মাধ্যমে সংগীতজগতে প্রবেশ করেন মাইকেল। বয়স তখন খুব কম। কিন্তু কণ্ঠের শক্তি, মঞ্চে উপস্থিতি এবং নাচের অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়। পরবর্তী সময়ে একক শিল্পী হিসেবে তাঁর উত্থান ছিল আরও বিস্ময়কর। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন ‘পপসম্রাট’ নামে পরিচিত বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পী।

১৯৭৯ সালে প্রকাশিত ‘অফ দ্য ওয়াল’ অ্যালবাম তাঁর একক ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আনে। তবে চার বছর পরের সাফল্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত ‘থ্রিলার’ তাঁকে বিশ্বসংগীতের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকাদের একজন করে তোলে।

‘থ্রিলার’-এর সাফল্যের ব্যাপ্তি ছিল অভূতপূর্ব। অ্যালবামটির ‘বিলি জিন’, ‘বিট ইট’, ‘হিউম্যান নেচার’, ‘দ্য গার্ল ইজ মাইন’, ‘পিওয়াইটি’, ‘ওয়ানা বি স্টার্টিন সামথিন’ এবং ‘থ্রিলার’-এর মতো গান একসঙ্গে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৮৪ সালের গ্র্যামি পুরস্কারে এক রাতে আটটি পুরস্কার জিতে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

‘থ্রিলার’ শুধু একটি সফল অ্যালবাম ছিল না; এটি জনপ্রিয় সংগীতের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্ভাবনাকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল। অ্যালবামটির সঙ্গে তৈরি প্রায় ১৪ মিনিটের ‘থ্রিলার’ সংগীতচিত্রও হয়ে ওঠে এক যুগান্তকারী কাজ। পরিচালক জন ল্যান্ডিসের নির্মাণে গান, নৃত্য, অভিনয়, পোশাক, বিশেষ প্রভাব এবং চলচ্চিত্রের ভাষা একসঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। এর মাধ্যমে মাইকেল দেখিয়েছিলেন, সংগীতচিত্রও নিজস্ব শিল্পরূপ হিসেবে দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে মাইকেল জ্যাকসনের সবচেয়ে পরিচিত পরিচয়গুলোর একটি ছিল তাঁর নৃত্য।

মঞ্চে তাঁর শরীরের প্রতিটি ভঙ্গি যেন সংগীতের সঙ্গে কথা বলত। তাঁর বিখ্যাত ‘মুনওয়াক’ মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। পা যেন মাটিতে আটকে আছে, অথচ শরীর এগিয়ে যাচ্ছে—এই ভঙ্গি পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য নৃত্যশিল্পীকে প্রভাবিত করেছে। তাঁর পরিবেশনায় গান ও নৃত্য কখনো আলাদা দুটি বিষয় মনে হতো না; বরং দুটিই একসঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ মঞ্চশিল্পে পরিণত হতো।

মাইকেলের প্রভাব সংগীতের গণ্ডিতেও থেমে থাকেনি। কৃষ্ণাঙ্গ একজন শিল্পী হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক মূলধারার বিনোদনজগতে এমন উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, যা পরবর্তী প্রজন্মের বহু শিল্পীর জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। তাঁর সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছিল, ভাষা, জাতিগত পরিচয় ও ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়েও একজন শিল্পী বৈশ্বিক শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে পারেন।

তাঁর ক্যারিয়ারে পুরস্কারের সংখ্যাও ছিল বিপুল। আটটি গ্র্যামির ঐতিহাসিক রাতের পাশাপাশি তিনি গ্র্যামি কিংবদন্তি পুরস্কারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সম্মান পেয়েছেন। মৃত্যুর পরও তাঁর কাজের স্বীকৃতি অব্যাহত থাকে।

মানবিক কর্মকাণ্ডেও মাইকেল জ্যাকসনের সম্পৃক্ততা ছিল। ‘উই আর দ্য ওয়ার্ল্ড’ উদ্যোগে তাঁর অংশগ্রহণ বিশেষভাবে স্মরণীয়। আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সহায়তায় অর্থ সংগ্রহের সেই উদ্যোগে বিশ্বের বহু খ্যাতিমান শিল্পী যুক্ত হয়েছিলেন। মাইকেলের জনপ্রিয়তা এমন উদ্যোগকে বিপুল মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

তবে তাঁর জীবন ছিল কেবল সাফল্য আর আলোয় ভরা নয়। বিপুল খ্যাতির পাশাপাশি তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক, অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত সংকট। তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়ে বিশ্বমাধ্যমের প্রবল আগ্রহ অনেক সময় তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপনকে কঠিন করে তুলেছিল। জনপ্রিয়তার চূড়ায় থাকা একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন কীভাবে জনসমক্ষে চলে আসে, মাইকেলের জীবন তার একটি আলোচিত উদাহরণ হয়ে আছে।

২০০৯ সালের ২৫ জুন মাত্র ৫০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়। একজন শিল্পীর মৃত্যু যে একই সঙ্গে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ঘটনার রূপ নিতে পারে, মাইকেলের বিদায় সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছিল। বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ তাঁর গান শুনে, তাঁর নাচ অনুসরণ করে এবং তাঁর স্মৃতি স্মরণ করে শোক প্রকাশ করেছিলেন।

কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু আর শিল্পের মৃত্যু এক বিষয় নয়।

মাইকেলের ক্ষেত্রেও সেটিই সত্যি হয়েছে।

আজও ‘বিলি জিন’ বাজলে তাঁর নৃত্যের কথা মনে পড়ে। ‘হিল দ্য ওয়ার্ল্ড’ মানবতার প্রতি তাঁর আহ্বানকে সামনে আনে। ‘ম্যান ইন দ্য মিরর’ মানুষকে নিজের দিকে ফিরে তাকানোর অনুপ্রেরণা দেয়। আর ‘থ্রিলার’ এখনও সংগীতচিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য সৃষ্টির নাম।

তাঁর গান নতুন প্রজন্ম শুনছে। তাঁর নৃত্য অনুকরণ করছে অসংখ্য শিল্পী। তাঁর মঞ্চপরিবেশনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, পুরোনো কাজ নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছাচ্ছে। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে তাঁর প্রভাবও বারবার ফিরে আসছে।

এই কারণেই মাইকেল জ্যাকসনকে শুধু অতীতের একজন তারকা হিসেবে দেখলে তাঁর গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যায় না। তিনি এমন এক শিল্পী, যাঁর সৃষ্টিশীলতা পরবর্তী প্রজন্মের সংগীত, নৃত্য ও মঞ্চপরিবেশনার ভাষাকে প্রভাবিত করেছে।

২৯ আগস্ট তাঁর জন্মদিনে তাই শুধু একজন প্রয়াত শিল্পীকে স্মরণ করা হয় না। স্মরণ করা হয় এমন একজন স্রষ্টাকে, যিনি নিজের শিল্প দিয়ে কোটি মানুষের কল্পনাকে নাড়া দিয়েছিলেন।

মানুষ চলে যায়।
কণ্ঠ একদিন থেমে যায়।
মঞ্চের আলো নিভে যায়।

কিন্তু সত্যিকারের শিল্প থেকে যায়।

যতদিন গান থাকবে, যতদিন মানুষ নাচবে, যতদিন মঞ্চে আলো জ্বলবে এবং শিল্পীরা নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখবেন, ততদিন মাইকেল জ্যাকসনের প্রভাবও কোনো না কোনোভাবে বেঁচে থাকবে।

তিনি আজ চোখের সামনে নেই। তবু তাঁর গান আছে, তাঁর নৃত্য আছে, তাঁর সৃষ্টি আছে। আর সেই সৃষ্টির মধ্যেই তিনি বারবার ফিরে আসেন নতুন প্রজন্মের কাছে।

না থেকেও যিনি আছেন—তিনিই মাইকেল জ্যাকসন।

শুভ জন্মদিন, কিংবদন্তি। আপনার শিল্পের মৃত্যু নেই।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর