বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের অবদান শুধু সাহিত্য রচনায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা হারিয়ে যেতে বসা সাহিত্যকর্ম উদ্ধার করেছেন, বিস্মৃত কবি ও লেখকদের পরিচয় সামনে এনেছেন এবং অতীতের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করেছেন। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছিলেন তেমনই এক অসাধারণ গবেষক ও সংগ্রাহক। পুরোনো পুঁথির পাতায় ছড়িয়ে থাকা বাংলার বিস্মৃত সাহিত্য-ইতিহাসকে তিনি দীর্ঘদিনের শ্রম, অনুসন্ধান ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছিলেন সাহিত্যিক, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-অনুসন্ধানী, প্রাচীন পুঁথির সংগ্রাহক, সম্পাদক ও গবেষক। বিশেষ করে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমান কবি ও সাহিত্যিকদের অবদান অনুসন্ধান এবং তাঁদের সাহিত্যকর্মকে বৃহত্তর সাহিত্য-ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
১৮৭১ সালের ১১ অক্টোবর চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার সুচক্রদণ্ডী গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা মুন্সী নুরুদ্দীন তাঁর জন্মের আগেই মারা যান। অল্প বয়সেই মাকেও হারান তিনি। পিতৃ-মাতৃহীন অবস্থায় তাঁকে লালন-পালন করেন চাচা অছিরুদ্দীন। শৈশবের এই প্রতিকূলতা তাঁর জ্ঞানার্জনের আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং শিক্ষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ক্রমেই গভীর হয়।
১৮৯৩ সালে পটিয়া হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। পরে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পর চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে যোগ দেন। কর্মজীবনের একপর্যায়ে বিভাগীয় স্কুল পরিদর্শকের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৩৪ সালে চাকরি থেকে অবসর নেন।
তবে সরকারি চাকরি ছিল তাঁর জীবিকার অংশ, আর সাহিত্য ও গবেষণা ছিল তাঁর আজীবনের সাধনা।
প্রাচীন বাংলা পুঁথির প্রতি তাঁর আকর্ষণ একসময় তাঁকে নিয়ে যায় দীর্ঘ ও কঠিন এক অনুসন্ধানের পথে। গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে তিনি পুরোনো পুঁথির সন্ধান করতেন। অনেক পাণ্ডুলিপি পাওয়া যেত মানুষের ঘরের পুরোনো সিন্দুকে, আলমারিতে কিংবা অবহেলায় পড়ে থাকা কোনো স্থানে। সে সময় এসব পুঁথির বড় অংশই যথাযথভাবে সংরক্ষিত ছিল না। ফলে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল প্রবল।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ উপলব্ধি করেছিলেন, এসব পুঁথি শুধু পুরোনো কাগজের দলিল নয়। এগুলোর পাতায় রয়েছে বাংলা ভাষার বিবর্তন, সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতা, কবি-লেখকদের পরিচয় এবং তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির নানা তথ্য। এই উপলব্ধিই তাঁকে বাংলা পুঁথি-গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ করে তোলে।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমান কবিদের অবদান ছিল তাঁর গবেষণার অন্যতম প্রধান বিষয়। তাঁর সংগৃহীত পুঁথির মাধ্যমে দৌলত কাজী, আলাওল, সৈয়দ সুলতান, মুহম্মদ খানসহ বহু কবির সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে নতুন করে জানার সুযোগ তৈরি হয়। তাঁর অনুসন্ধানের ফলে এমন প্রায় একশ জন মুসলমান কবির নাম ও সাহিত্যকর্মের পরিচয় সামনে আসে, যাঁদের সম্পর্কে এর আগে সাহিত্য-ইতিহাসে খুব সামান্য তথ্য ছিল কিংবা কোনো তথ্যই পাওয়া যেত না।
এ কারণে তাঁর কাজকে শুধু পুঁথি সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই। তিনি মূলত বাংলা সাহিত্যের বিস্মৃত অধ্যায়গুলো পুনরুদ্ধারের কাজ করেছিলেন।
১৯২০-২১ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ তাঁর সংগৃহীত বাংলা পুঁথির তালিকা ‘বাঙালা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ’ নামে দুই খণ্ডে প্রকাশ করে। বাংলা পুঁথি-গবেষণার ক্ষেত্রে এই সংকলন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তাঁর সংগ্রহের পাণ্ডুলিপির একটি বড় অংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে তাঁর সংগ্রহের পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত হয়েছে। তাঁর পুঁথি-সংগ্রহের ঐতিহ্যের সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সংগ্রহেরও সম্পর্ক রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপির তালিকা ‘পুঁথি পরিচিতি’ নামে প্রকাশ করেছে।
তাঁর সংগ্রহে মোট কতটি পুঁথি ছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়। কোথাও প্রায় ১ হাজার ৭০০টি, আবার কোথাও আড়াই হাজারের বেশি পুঁথির উল্লেখ রয়েছে। সংখ্যার এই পার্থক্যের চেয়ে বড় বিষয় হলো, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি যে বিপুল পরিমাণ প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ শুধু সংগ্রাহক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান সম্পাদক ও গবেষকও। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের ১১টি গ্রন্থ সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘ইসলামাবাদ’, যেখানে চট্টগ্রামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
ড. মুহম্মদ এনামুল হকের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি রচনা করেন ‘আরাকান রাজসভায় বাঙলা সাহিত্য’। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত এই গবেষণাগ্রন্থে আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরা হয়। বাংলা সাহিত্যের বিকাশ যে শুধু একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল—এই ধরনের গবেষণা তা বুঝতে সহায়তা করে।
তাঁর গবেষণার পরিধি ছিল আরও বিস্তৃত। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর বিপুলসংখ্যক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। বাংলা সাহিত্যকে তিনি কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখেননি। মুসলমান কবিদের অবদান অনুসন্ধানের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনালোচিত ও কম আলোচিত একটি বড় অংশকে সামনে নিয়ে আসেন। ফলে তাঁর গবেষণা বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক ইতিহাসকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করে।
বাংলা ভাষা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়েও তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল স্পষ্ট। ভাষা ও সাহিত্যকে তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর গবেষণায় বাংলা ভাষার সাহিত্যিক বিকাশের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায় ও অঞ্চলের সাহিত্যচর্চার আন্তঃসম্পর্কও উঠে এসেছে।
তাঁর সাহিত্য ও গবেষণাকর্মের স্বীকৃতিও মিলেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। চট্টল ধর্মমণ্ডলী তাঁকে ‘সাহিত্যবিশারদ’ উপাধিতে ভূষিত করে। নদীয়া সাহিত্যসভা তাঁকে দেয় ‘সাহিত্যসাগর’ উপাধি। তবে ‘সাহিত্যবিশারদ’ উপাধিটিই তাঁর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি স্থায়ীভাবে যুক্ত হয় এবং পরবর্তীকালে তিনি নিজের নামের সঙ্গে এই উপাধি ব্যবহার করেন।
তাঁর কর্মপরিধি বোঝাতে সাহিত্যিক মাহবুব উল আলমের একটি মন্তব্য প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। তাঁকে দেখে মাহবুব উল আলম নাকি ক্ষিতিমোহনকে বলেছিলেন, “উনি ব্যক্তিমাত্র নহেন, উনি একটা প্রতিষ্ঠান।” তাঁর দীর্ঘদিনের পুঁথি সংগ্রহ, গবেষণা ও সম্পাদনার ব্যাপ্তির কারণে এই মন্তব্যটি তাঁর কর্মজীবনের একটি প্রতীকী মূল্যায়ন হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে।
আজকের মতো তখন ছিল না ডিজিটাল আর্কাইভ, আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি কিংবা দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা। প্রাচীন পুঁথি খুঁজে বের করা, সংগ্রহ করা, পাঠোদ্ধার করা এবং সেগুলো নিয়ে গবেষণা চালানো ছিল সময়সাপেক্ষ ও শ্রমনির্ভর কাজ। সেই বাস্তবতায় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সংরক্ষণে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
তাঁকে শুধু পুঁথি-সংগ্রাহক হিসেবে দেখলে তাঁর কাজের ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। তিনি ছিলেন বিস্মৃত সাহিত্যকর্মের অনুসন্ধানী, হারিয়ে যাওয়া কবিদের পরিচয় সামনে আনার গবেষক এবং প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংরক্ষণের একনিষ্ঠ কর্মী।
যেসব পুঁথি হয়তো পুরোনো ঘরের কোনো সিন্দুকে পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যেতে পারত, তাঁর অনুসন্ধানের ফলে সেগুলোর অনেকগুলোই গবেষণার উপকরণে পরিণত হয়। সেই পাণ্ডুলিপির পাতায় পাওয়া কবিতা, কাব্য ও সাহিত্যিক পরিচয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের নানা অনালোচিত অধ্যায়কে সমৃদ্ধ করেছে।
১৯৫৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুর বহু দশক পরও তাঁর সংগ্রহ, গবেষণা ও সম্পাদিত গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৫ সালে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন সাহিত্যগবেষককে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলা সাহিত্যের হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য সংরক্ষণে একজন মানুষের দীর্ঘ ও নিবেদিত প্রচেষ্টাকেও স্মরণ করা।
পুঁথির হলুদ হয়ে যাওয়া পাতায় তিনি খুঁজেছিলেন বাংলার অতীত। সেই অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে তিনি তুলে এনেছিলেন বহু বিস্মৃত কবি, সাহিত্যকর্ম ও সাহিত্য-ইতিহাসের অধ্যায়। তাঁর রেখে যাওয়া সংগ্রহ ও গবেষণা আজও মনে করিয়ে দেয়—একটি জাতির সাহিত্যিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করতে কখনো কখনো একজন মানুষের দীর্ঘদিনের একাগ্র শ্রমই হয়ে উঠতে পারে অমূল্য সম্পদ।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।









