খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই জুলাই ২০২৬, ২:৩৫ পিএম

ঊনবিংশ শতকের বাংলা নবজাগরণের ইতিহাসে যে কজন নারী তাঁদের মেধা, সাহিত্যসাধনা ও সমাজসেবার মাধ্যমে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাঁদের মধ্যে স্বর্ণকুমারী দেবীর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, গীতিকার, সম্পাদক, সমাজসংস্কারক এবং নারীজাগরণের অন্যতম অগ্রদূত।
জন্ম ২৮ আগস্ট ১৮৫৫ সালে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঐতিহ্যবাহী ঠাকুর পরিবারে। তিনি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দশম সন্তান এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ ভগ্নি। এমন এক পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা, যেখানে সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও শিল্পচর্চা ছিল দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সেই সময়ের সামাজিক প্রথা অনুযায়ী তিনি বাড়িতেই শিক্ষা গ্রহণ করেন। মাত্র বারো বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট জানকীনাথ ঘোষালের সঙ্গে। জানকীনাথ ছিলেন প্রগতিশীল ও উদার চিন্তার মানুষ। তিনি স্ত্রীকে পর্দাপ্রথা পরিত্যাগ করতে উৎসাহিত করেন এবং সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করেন। এই সমর্থনই স্বর্ণকুমারীর প্রতিভা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শৈশব থেকেই তাঁর সাহিত্য প্রতিভার পরিচয় মেলে। জোড়াসাঁকোর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ ছিল। উপন্যাস, কবিতা, নাটক, গীতিনাট্য, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও গান—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করেন।
১৮৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস ‘দীপনির্বাণ’ তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। পরবর্তীকালে ‘ছিন্নমুকুল’, ‘স্নেহলতা’, ‘পালিতা’, ‘কাহাকে’ প্রভৃতি উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান লাভ করে। তাঁর ‘কাহাকে’ উপন্যাসটি পরে The Unfinished Song নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয় এবং বিদেশি পাঠকদের কাছেও সমাদৃত হয়।
১৮৭৯ সালে তিনি ‘বসন্ত উৎসব’ নামে একটি গীতিনাট্য রচনা করেন, যা বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম দিকের অপেরাগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় পঁচিশটি।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংবাদিকতায়ও তিনি অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। ঠাকুর পরিবারের সাহিত্যপত্র ‘ভারতী’-এর সম্পাদক হিসেবে তিনি প্রায় ত্রিশ বছর দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সম্পাদনায় ভারতী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাময়িকপত্রে পরিণত হয় এবং বহু নবীন লেখক আত্মপ্রকাশের সুযোগ পান।
স্বর্ণকুমারী দেবী কেবল সাহিত্যিকই ছিলেন না; ছিলেন সমাজসচেতন মানবতাবাদী। নারীশিক্ষা, নারীর আত্মমর্যাদা এবং সমাজে তাঁদের প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি নিরলসভাবে কাজ করেন। বিধবা ও অসহায় নারীদের সহায়তার উদ্দেশ্যে তিনি ‘সখী সমিতি’ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, যা সে সময় নারীকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল।
জাতীয় চেতনা ও সমাজসংস্কার আন্দোলনেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ১৮৮৯ ও ১৮৯০ সালে তিনি পণ্ডিতা রামাবাই, রামাবাই রানাডে এবং কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর সঙ্গে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দেন। তিনি বাংলা প্রদেশের প্রতিনিধিত্বকারী প্রথম দুই নারী প্রতিনিধির একজন ছিলেন—যা সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
তাঁর সাহিত্য ও সমাজসেবামূলক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯২৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক প্রদান করে। ১৯২৯ সালে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন—যা তাঁর সাহিত্যিক মর্যাদার উজ্জ্বল স্বীকৃতি।
১৯৩২ সালের ৩ জুলাই এই অসামান্য সাহিত্যসাধক ও সমাজসংস্কারক পরলোকগমন করেন। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, চিন্তা ও সমাজকল্যাণমূলক কর্ম আজও বাংলা সাহিত্য ও নারীজাগরণের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে আছে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির নারী সাহিত্যিকদের অন্যতম স্বর্ণকুমারী দেবী প্রমাণ করে গেছেন—প্রতিভা, অধ্যবসায় ও মানবকল্যাণের আদর্শ একসঙ্গে ধারণ করলে একজন মানুষ সময়কে অতিক্রম করে ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠেন। তাঁর সাহিত্যকীর্তি, প্রগতিশীল চিন্তা এবং নারীসমাজের উন্নয়নে অনন্য অবদান আজও সমানভাবে প্রেরণার উৎস।
মন্তব্য