জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জুলাই ২০২৬, ৫:১১ পিএম

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন কিছু বীর সেনানায়কের নাম রয়েছে, যাঁদের অবদান ইতিহাসের পাতায় সবসময় উজ্জ্বল হয়ে থাকে। তাঁদেরই একজন মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ। তিনি ছিলেন একজন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা, ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার, সংগঠক এবং সুন্দরবনের জেলে জনগোষ্ঠীর অকৃত্রিম বন্ধু। ১৯৭১ সালের রণাঙ্গন থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি লড়ে গেছেন দেশ, মানুষ ও ন্যায়বিচারের পক্ষে।
১৯৫০ সালের ডিসেম্বর মাসে পিরোজপুর শহরের এক শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতা অ্যাডভোকেট আফতাব উদ্দীন আহমেদ ছিলেন পিরোজপুর পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান। প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী জিয়াউদ্দিন ছাত্রজীবন থেকেই নেতৃত্বের অসাধারণ গুণাবলি প্রদর্শন করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি পিরোজপুর ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে যোগ দেন।
১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তখন তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন। তবে মাতৃভূমির ডাক তাকে স্থির থাকতে দেয়নি। জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে তিনি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে ভারতে এসে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তাঁর রণকৌশল ও নেতৃত্বের দক্ষতা দেখে তাঁকে ৯ নম্বর সেক্টরের সুন্দরবন সাব-সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর অধীনে সুন্দরবন, মংলা, শরণখোলা, বাগেরহাট ও সমগ্র উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক সফল গেরিলা ও সম্মুখ যুদ্ধ পরিচালিত হয়।
বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট থেকে টানা ১২ দিনের এক দুঃসাহসিক অভিযানে তাঁর নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনীর একাধিক নৌযান ধ্বংস এবং তাদের রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। উপকূলীয় অঞ্চলে তাঁর নির্দেশনায় পরিচালিত সামরিক অপারেশনগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তাঁকে এক জীবন্ত কিংবদন্তির মর্যাদা এনে দিয়েছিল।
স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ফিরে যান এবং পরবর্তীতে মেজর পদে উন্নীত হন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তিনি ঢাকায় ডিজিএফআই-তে কর্মরত ছিলেন। ৭ নভেম্বরের ঘটনাবহুল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি কর্নেল তাহেরের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। পরবর্তীতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সামরিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতির বিশেষ সাধারণ ক্ষমার আওতায় তিনি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।
কারামুক্তির পর ১৯৮৩ সালে তিনি কিছুদিনের জন্য সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান। কিন্তু দেশের মাটি ও মানুষের টান তাঁকে আবার ফিরিয়ে আনে। তিনি ফিরে যান তাঁর প্রিয় সুন্দরবনের দুবলার চরে এবং শুরু করেন এক নতুন জীবনের সংগ্রাম। সেখানে বনদস্যু ও ডাকাতদের নির্মম নির্যাতনে জর্জরিত মেহনতি জেলে সম্প্রদায়কে সংগঠিত করার কাজে হাত দেন। শুঁটকি শিল্পের আমূল পরিবর্তন ও জেলেদের অধিকার রক্ষায় তিনি গড়ে তোলেন ‘দুবলা ফিসারমেন গ্রুপ’ এবং দীর্ঘদিন এর চেয়ারম্যান হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। শুধু তা-ই নয়, ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ নামক অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রান্তিক মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতে তিনি আজীবন সোচ্চার ছিলেন।
দস্যুমুক্ত সুন্দরবন গড়ার লড়াইয়ে তাঁর এই আপসহীন অবস্থানের কারণে একাধিকবার তাঁর ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয় এবং তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। কোনো বাধাই তাঁকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। দস্যুদের বিরুদ্ধে তাঁর সাহসী অবস্থান ও সাধারণ জেলেদের পাশে দাঁড়ানোর কারণে তিনি গোটা উপকূলীয় অঞ্চলে এক অনন্য আস্থার প্রতীকে পরিণত হন।
নিজের অম্লান যুদ্ধস্মৃতি এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের যুদ্ধের ইতিহাস নথিভুক্ত করতে তিনি রচনা করেন ‘সুন্দরবন সমরে ও সুষমায়’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থটি। বইটি স্বাধীনতা যুদ্ধের এক অমূল্য দলিল হিসেবে সর্বমহলে স্বীকৃতি পেয়েছে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ২৮ জুলাই সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে পদার্পণ করার আগেই এই বীর সেনানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে স্বাধীনতার এই বীর সেনানায়কের স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
মন্তব্য