,

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দর কমেছে

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে ফের পতন হয়েছে। জ্বালানি তেলের দামে বড় উল্লম্ফনের কারণে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ চলতি সপ্তাহের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে সুদের হার বাড়াতে পারে—বাজারে এমন প্রত্যাশা জোরালো হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে স্বর্ণের বাজারে।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্পট স্বর্ণের দাম ০ দশমিক ৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩৩৪ দশমিক ৩১ ডলারে নেমে যায়। এর আগে শুক্রবারও স্বর্ণের দর কমেছিল। ফলে টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো সাপ্তাহিক দরপতনের মুখে পড়েছে মূল্যবান এই ধাতু। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণের ফিউচার ০ দশমিক ৮ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩৭৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের মতে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি স্বর্ণের জন্য খুব একটা অনুকূল নয়। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি ফেডারেল রিজার্ভ ও জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠক সামনে থাকায় সুদের হার বাড়ানোর প্রত্যাশা বেড়েছে। এতে স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

স্বর্ণের বাজারে সুদের হারের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বর্ণ থেকে কোনো সুদ বা নির্দিষ্ট মুনাফা পাওয়া যায় না। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়ালে সুদযুক্ত সম্পদ, যেমন বন্ড বা আমানতভিত্তিক বিনিয়োগ, তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। তখন কিছু বিনিয়োগকারী স্বর্ণের পরিবর্তে আয় প্রদানকারী সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এর ফলে স্বর্ণের চাহিদা ও দামে চাপ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির তথ্যও বাজারের এই প্রত্যাশাকে শক্তিশালী করেছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আগস্টে দেশটির ভোক্তা মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতির মৌলিক সূচকও চার মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি ফেডের সামনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ও বুধবার অনুষ্ঠেয় ফেডের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা প্রায় ৮৬ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। মূল্যস্ফীতির সর্বশেষ তথ্য প্রকাশের আগে এই সম্ভাবনা ছিল প্রায় ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন মূল্যস্ফীতি-তথ্য প্রকাশের পর বাজারে সুদের হার বাড়ার প্রত্যাশা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তবে স্বর্ণের বাজারে সব চাপই নিম্নমুখী নয়। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্বজুড়ে মুদ্রানীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় দর কমলে আবারও ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়তে পারে বলে মনে করেন ওয়াটারার। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্বর্ণকে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন।

জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তও আন্তর্জাতিক বাজারে নজর কাড়ছে। শুক্রবার দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াতে পারে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। স্থায়ী মূল্যস্ফীতি, অর্থনীতির স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি এবং জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রানীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা। সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সৌদি আরবে হুতিদের নতুন হামলা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি জাহাজে ইরানের হামলার ঘটনায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধ থাকায় সরবরাহ সংকটের আশঙ্কাও আরও জোরালো হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে নির্ধারিত একটি বৈঠক পিছিয়ে গেছে। ফলে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বাজারের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তেলের দামে বড় ধরনের বৃদ্ধি হলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

এদিকে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও দুর্বলতা দেখা গেছে। সোমবার স্পট রুপার দাম ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৬৪ দশমিক ০২ ডলারে নেমেছে। প্লাটিনামের দাম প্রায় অপরিবর্তিত থেকে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৭৯৬ দশমিক ৯০ ডলারে অবস্থান করেছে। প্যালাডিয়ামের দামেও সামান্য পরিবর্তন হয়েছে; ধাতুটির দাম দাঁড়িয়েছে প্রতি আউন্স ১ হাজার ২৯৮ দশমিক ৮০ ডলার।

স্বর্ণের পরবর্তী দিকনির্দেশনা নির্ধারণে এখন কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির গতিপথ, জাপানের মুদ্রানীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। সুদের হার বাড়ানোর প্রত্যাশা অব্যাহত থাকলে স্বর্ণের ওপর চাপ থাকতে পারে। বিপরীতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা আবারও বাড়ার সুযোগ রয়েছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।