স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও স্ক্রিনিং ক্যান্সার প্রতিরোধ

সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সময়মতো স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে ক্যান্সারের একটি বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব—এমন অভিন্ন মত দিয়েছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কার্যকর প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ গ্রহণ না করলে আগামী কয়েক দশকে ক্যান্সার দেশের জন্য বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে বিশ্ব ক্যান্সার দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ওয়েলবিং ফাউন্ডেশন, জেসিআই ঢাকা ডিপ্লোমেটস এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ‘ক্যান্সার প্রিভেনশন: লাইফস্টাইল, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্বাস্থ্য পেশাজীবী, শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবী ও সাধারণ অংশগ্রহণকারীরা অনলাইনে যুক্ত হয়ে ক্যান্সার প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে মতবিনিময় করেন।

সেমিনারে গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের পাবলিক হেলথ বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, “ক্যান্সার প্রতিরোধে প্রাথমিক সচেতনতা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অপরিহার্য। বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।”

বাংলাদেশ ক্যান্সার ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার মূল প্রবন্ধে বলেন, ক্যান্সারের একটি বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য। তিনি বলেন, তামাকবর্জন, সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং সময়মতো স্ক্রিনিং ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এছাড়া তিনি কমিউনিটিভিত্তিক ক্যান্সার সেবা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বিস্তারের ওপর গুরুত্ব দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ সতর্ক করে বলেন, “ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে। শুধুমাত্র সচেতনতা বা আলোচনা যথেষ্ট নয়; কার্যকর নীতি ও বহুমুখী সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।”

নারীদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সারের প্রতিরোধে নিয়মিত স্ক্রিনিং, স্ব-পরীক্ষা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা গ্রহণ জরুরি বলে উল্লেখ করেন ডা. আলি নাফিসা। আইশা সিদ্দিকা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বের ওপর গুরুত্ব দেন এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়ার পরামর্শ দেন।

গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে মুজাহিদ শুভ বলেন, ক্যান্সার নিয়ে ভুল ধারণা, ভয় ও কুসংস্কার দূর করতে সঠিক তথ্য প্রচারে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল হতে হবে। মো. আনিসুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহার করে সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।

সেমিনার সঞ্চালনা করেন ওয়েলবিং ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট মো. রাজিকুল হাসান। তিনি বলেন, “ক্যান্সার প্রতিরোধ একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”

নিচের টেবিলে ক্যান্সার প্রতিরোধমূলক প্রধান পদক্ষেপগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপবিস্তারিত কার্যক্রম
তামাকবর্জনধূমপান ও অন্য তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার বন্ধ
স্বাস্থ্যকর খাদ্যপ্রচুর ফল, শাকসবজি, কম প্রক্রিয়াজাত খাবার
নিয়মিত ব্যায়ামসপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট মাঝারি ব্যায়াম
সময়মতো স্ক্রিনিংস্তন, প্রস্রাবনালী, গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা
সচেতনতা বৃদ্ধিস্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, সামাজিক মিডিয়া ও গণমাধ্যমে প্রচার

বিশেষজ্ঞরা মনে করান, ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সামাজিক সচেতনতা, স্বাস্থ্যনীতি এবং ব্যক্তিগত জীবনধারার পরিবর্তন সমন্বিতভাবে প্রয়োজন। সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে আগামী ১৫–২০ বছরে দেশের ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।