বাংলা গানের বিশাল ক্যানভাসে এমন কিছু কণ্ঠ থাকে, যা শুধু কানে বাজে না, বরং শ্রোতার মননে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে। তাঁদের সুরের মুর্ছনা সময় পার হয়ে পৌঁছে যায় প্রজন্মান্তরে। সেই কালজয়ী কণ্ঠশিল্পীদের তালিকায় একদম সামনের সারিতে জ্বলজ্বল করছে একটি নাম—হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তাঁর মখমলি, গম্ভীর ও পরম মায়াময় স্বর বাংলা তো বটেই, পুরো ভারতীয় সংগীত জগতেই এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
১৯২০ সালের ১৬ জুন ভারতের বারাণসীতে জন্ম নেওয়া এই মহান শিল্পীর শৈশব ও কৈশোরের অনেকটাই কেটেছে কলকাতায়। সেখানকার ঐতিহ্যবাহী ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে পড়ার সময়ই তাঁর সঙ্গে গভীর সখ্য গড়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের। তখনকার সেই কৈশোরের বন্ধুত্ব জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিল।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি প্রবেশ করেছিলেন ঐতিহ্যবাহী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু যাঁর রক্তে সুরের ধারা প্রবাহিত, তাঁকে কি আর বিজ্ঞানের শুষ্ক পরিভাষায় আটকে রাখা যায়? সুরের অমোঘ টানে একসময় প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ছেড়ে তিনি পুরোদমে নেমে পড়েন সংগীতের জগতে। সুরসাধনার পাশাপাশি তরুণ বয়সে সাহিত্যের প্রতিও তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল, নিয়মিত লেখালিখিও করতেন তিনি।
সংগীতের জগতে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পদচারণা শুরু হয় খুবই কম বয়সে। ১৯ ৩৩ সালে শৈলেশ দাশগুপ্তের হাত ধরে জীবনের প্রথম গান ‘আমার গানেতে এল নবরূপী চিরন্তন’ রেকর্ড করেন। প্রথম পদক্ষেপে আশানুরূপ বাণিজ্যিক সাফল্য না পেলেও তিনি পিছপা হননি। ১৯৩৭ সালে কবি নরেশ ভট্টাচার্যের কথায় এবং শৈলেশ দাশগুপ্তের সুরে ‘জানিতে যদি গো তুমি’ ও ‘বলো গো বলো মোরে’ শিরোনামে দুটি গান রেকর্ড করার পরই শ্রোতামহলে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে।
চল্লিশের দশকে সংগীত রূপকার কমল দাশগুপ্তসহ তৎকালীন প্রখ্যাত সব সুরস্রষ্টাদের ছোঁয়ায় তাঁর গায়কি আরও পরিপক্ব হয়ে ওঠে। ফয়েজ হাশমীর কথায় ‘কিতনা দুখ ভুলায়া তুমনে’ দিয়ে হিন্দি গান রূপায়ণেও তিনি নতুনত্বের পরিচয় দেন। একদিকে চলচ্চিত্রের সুরের মূলধারা, অন্যদিকে রবীন্দ্রসংগীতের গভীরতা—সবক্ষেত্রেই তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর দরদি কণ্ঠে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’, ‘কী গোপন কথা’, ‘এই রাত তোমার আমার’ কিংবা ‘জীবনপুরের পথিক রে ভাই’-এর মতো একের পর এক সৃষ্টি বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।
বিশেষ করে বাংলা চলচ্চিত্রে মহানায়ক উত্তম কুমারের রূপালী পর্দার উপস্থিতির পেছনে হেমন্তের কণ্ঠ যেন ছিল এক জাদুকরী চালিকাশক্তি। পর্দায় উত্তমের ব্যক্তিত্ব আর নেপথ্যে হেমন্তের সুরমেলানো কণ্ঠ—দুটি মিলে তৈরি করেছিল এক মহাকাব্যিক মেলবন্ধন। ‘সপ্তপদী’, ‘সাগরিকা’, ‘হারানো সুর’, ‘শাপমোচন’ ও ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এর মতো বহু কালজয়ী সিনেমায় তাঁদের যৌথ উপস্থিতি আজও সিনেমার গান ভালোবাসেন এমন যেকোনো মানুষের কাছে পরম প্রিয়।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৪৫ সালে সংগীতশিল্পী বেলা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঘর বাঁধেন তিনি। তাঁদের কোল আলো করে আসে ছেলে জয়ন্ত ও মেয়ে রাণু। পরবর্তীকালে রাণু মুখোপাধ্যায় ষাট ও সত্তরের দশকে সংগীতে স্বকীয় পরিচয় তৈরি করেছিলেন। পাশাপাশি হেমন্তের ছোট ভাই অমল মুখোপাধ্যায়ও সংগীত পরিচালনা ও কণ্ঠশিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন।
গায়ক পরিচয়ের পাশাপাশি সংগীতপরিচালক ও প্রযোজক হিসেবেও তিনি ছিলেন দারুণ সফল। সর্বভারতীয় পর্যায়ে ‘হেমন্ত কুমার’ নামে কাজ করার সুবাদে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতেও তাঁর ছিল সমান প্রতিপত্তি। ঐতিহাসিক ‘নাগিন’ চলচ্চিত্রের কালজয়ী সুর পরিচালনা তাঁর সংগীত জীবনের অন্যতম সেরা অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।
১৯৮৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতায় চিরবিদায় নেন এই মহান শিল্পী। শারীরিক বিদায় হলেও তাঁর মায়াবী কণ্ঠধারা বেঁচে আছে প্রতিটি বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়, বিরহী মনের কোণে আর স্মৃতির নিভৃত গহীনে। বাংলা গানের আকাশের সেই শুকতারা অমর হয়ে রইবেন চিরকাল।









