জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর জীবনের এক কোমল, মানবিক ও গভীর ভালোবাসার অধ্যায় জড়িয়ে আছে মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তেওতা গ্রামের সঙ্গে। এই গ্রাম শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়—এটি ছিলো তাঁর ভালোবাসার মানুষের শেকড়, তাঁর আত্মার টান।
তেওতা গ্রামকে তিনি হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছিলেন। সেই ভালোবাসারই এক শিল্পিত প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ছোট হিটলার’-এ—
“মাগো! আমি যুদ্ধে যাবোই নিষেধ কি মা আর মানি,
রাত্রিতে রোজ ঘুমের মাঝে ডাকে পোলান্ড-জার্মানি…”
এই কবিতাটি তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর দুই পুত্র সানি ও নিনির মুখে শোনানোর ভঙ্গিতে। তেওতা গ্রাম ছিলো তাঁদের মামার বাড়ি—আর সেই সূত্রেই এটি ছিলো নজরুলের শ্বশুরবাড়ি, তাঁর আপনজনের গ্রাম।
একটি নামের রূপান্তর, এক জীবনের গল্প
১৯০৮ সালের ১০ মে, তেওতা গ্রামেই জন্ম নেন এক কন্যা—আশালতা সেনগুপ্তা, স্নেহের নাম দুলি।
পরে তিনিই হয়ে ওঠেন প্রমীলা নজরুল—কবি নজরুলের প্রাণের সঙ্গিনী।
১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল, কলকাতায় তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। ‘প্রমীলা’ নামটি দিয়েছিলেন স্বয়ং নজরুল।
আশালতা সেনগুপ্তা, দোলোনা, দুলি—সব নাম মিলিয়ে একসময় তিনি পরিচিত হন প্রমীলা দেবী, প্রমীলা নজরুল ইসলাম, প্রমীলা সেনগুপ্ত নামেও।
পরিবার ও বেড়ে ওঠা
প্রমীলার পিতা বসন্ত কুমার সেনগুপ্ত এবং মাতা গিরিবালা দেবী—উভয়েরই জন্ম তেওতা গ্রামে।
পিতার মৃত্যুর পর মা গিরিবালা দেবী ছোট্ট দুলিকে নিয়ে আশ্রয় নেন দেবর ইন্দ্র কুমার সেনের কাছে, কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে।
সেই সময়ই কুমিল্লা সফরে এসে নজরুল ওঠেন ইন্দ্র কুমার সেনের বাড়িতে।
সেখানে বিরজাসুন্দরী দেবীর মাতৃস্নেহ এবং কিশোরী দুলির মধুর কণ্ঠে গান—এই দুইয়ের মোহে আবিষ্ট হন কবি।
সেই থেকেই শুরু হয় এক গভীর সম্পর্ক—যা পরিণত হয় দাম্পত্যে, ভালোবাসায়, এবং এক অনন্য জীবনের যাত্রায়।
ভালোবাসা, সাহিত্য ও উৎসর্গ
নজরুল তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘দোলনচাঁপা’ প্রিয়তমা প্রমীলার নামে উৎসর্গ করেন।
১৩৩০ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়—যা তাঁদের ভালোবাসার এক অনির্বচনীয় দলিল।
পরিবারের বিস্তার
নজরুল-প্রমীলার সংসার আলোকিত হয়েছিল দুই পুত্র—সব্যসাচী ও অনিরুদ্ধকে নিয়ে।
পরবর্তীতে তাঁদের বংশধরদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে সেই স্নেহের উত্তরাধিকার।
ত্যাগ, সেবা ও চিরবিদায়
জীবনের দীর্ঘ পথচলায় অসুস্থতা, দুঃখ-কষ্ট—সবকিছুর মাঝেও প্রমীলা দেবী আমৃত্যু তাঁর স্বামীকে সেবা করে গেছেন নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়।
অবশেষে ১৯৬২ সালের ৩০ জুন, দীর্ঘ রোগভোগের পর তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।
রয়ে যায় তাঁর স্মৃতি—ভালোবাসা, ত্যাগ আর নীরব মহিমায় ভরা এক জীবনগাথা।
শেষকথা
কবি নজরুল যেমন ভালোবেসেছিলেন তাঁর প্রেয়সী প্রমীলাকে,
তেমনি ভালোবেসেছিলেন তাঁর জন্মভূমি—ছায়াঘেরা, পাখির কলতানে ভরা তেওতা গ্রামকে।
প্রমীলা শুধু একজন স্ত্রী নন—তিনি ছিলেন কবির অনুপ্রেরণা, তাঁর দুঃসময়ের সাথী, তাঁর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
প্রেম, ত্যাগ ও অনন্ত নিবেদনের প্রতীক—
প্রমীলা নজরুল দেবী।
