সন্তান লাভের আশায় চিকিৎসার আশ্রয় নিতে গিয়ে এক গৃহবধূ যে ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হয়েছেন, তার কঠোর বিচার নিশ্চিত করল আদালত। মেহেরপুরে চিকিৎসার নামে ধর্ষণের দায়ে এক কবিরাজকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে দণ্ডিত ব্যক্তিকে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা হয়েছে, যা এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন।
মঙ্গলবার মেহেরপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আলী মাসুদ শেখ এ রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি হলেন মুজা শেখ ওরফে মুজা কবিরাজ (৬০)। তিনি মেহেরপুর সদর উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের শেখপাড়ার বাসিন্দা এবং হযরত আলীর ছেলে। আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাকে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৩ মার্চ চুয়াডাঙ্গার দর্শনা উপজেলার বুইচিতলা মাঝপাড়া গ্রামের এক নিঃসন্তান দম্পতি সন্তান লাভের আশায় কবিরাজি চিকিৎসা নিতে মেহেরপুরের পিরোজপুর গ্রামে যান। স্থানীয়ভাবে পরিচিত কবিরাজ মুজা শেখ তাদের চিকিৎসার আশ্বাস দেন। কথিত চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলে তিনি ওই দম্পতিকে একটি কক্ষে নিয়ে যান। এক পর্যায়ে ওষুধ খাওয়ানোর অজুহাতে স্বামীকে অজ্ঞান করে ফেলা হয়। সেই সুযোগে কবিরাজ গৃহবধূকে ধর্ষণ করেন।
এই নির্মম ঘটনার পরদিনই ভুক্তভোগী দম্পতি সাহস করে মেহেরপুর সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং ভুক্তভোগীর জবানবন্দি, চিকিৎসা প্রতিবেদনসহ অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর মুজা কবিরাজের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। বিচার চলাকালে একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত প্রমাণ আদালতে অপরাধ প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রায় ঘোষণার সময় রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন। আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মিয়াজান আলী। রায় প্রসঙ্গে পাবলিক প্রসিকিউটর বলেন, নিঃসন্তান এক গৃহবধূ চিকিৎসার আশায় গিয়ে যে ভয়াবহ অপরাধের শিকার হয়েছেন, তার ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এই রায় সমাজে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ দমনে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এবং প্রতারক ও অপরাধীদের জন্য কঠোর বার্তা দেবে।
এই মামলাটি সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরে—অন্ধ বিশ্বাস ও চিকিৎসার নামে প্রতারণা কীভাবে মানুষকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও আইনি নজরদারি জোরদার করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন অপরাধের শিকার না হন।
নিচে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| অপরাধের ধরন | চিকিৎসার নামে ধর্ষণ |
| দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি | মুজা শেখ (মুজা কবিরাজ) |
| বয়স | ৬০ বছর |
| রায়ের তারিখ | মঙ্গলবার (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল) |
| দণ্ড | যাবজ্জীবন কারাদণ্ড |
| জরিমানা | ৫০,০০০ টাকা |
| জরিমানা অনাদায়ে দণ্ড | আরও ১ বছর কারাদণ্ড |
| ঘটনার তারিখ | ৩ মার্চ ২০২১ |
| চার্জশিট দাখিল | ১৯ নভেম্বর ২০২১ |
এই রায় শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
