শ্রীলঙ্কার কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দেশটির সরকার। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যপ্রাণীর আক্রমণ এবং পোকামাকড়ের উপদ্রবে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি লাঘব করতে কৃষি ও কৃষি বীমা বোর্ড (AAIB) ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসকে ‘বীমা মাস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশটির প্রান্তিক কৃষকদের একটি শক্তিশালী সুরক্ষা বলয়ের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও বন্যপ্রাণীর উপদ্রব মোকাবিলা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কার কৃষকরা অনিয়মিত আবহাওয়া, আকস্মিক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে ব্যাপক ফসলহানির শিকার হচ্ছেন। এর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার এই দ্বীপরাষ্ট্রে বন্যহাতির আক্রমণ একটি বড় সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সারা বছরের হাড়ভাঙা খাটুনির ফসল এক রাতেই বন্যহাতির কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন রোগবালাই এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ তো রয়েছেই। এই বহুমুখী ঝুঁকিগুলো কৃষকদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বীমা পরিকল্পনা ও আর্থিক সুবিধা
এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড অ্যাগ্রারিয়ান ইন্স্যুরেন্স বোর্ড (AAIB) জানিয়েছে, এই বিশেষ বীমা কর্মসূচির আওতায় ধান, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ, সয়াবিন এবং মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের অর্থকরী ফসল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই বীমার প্রিমিয়াম বা কিস্তির হার অত্যন্ত সাশ্রয়ী রাখা হয়েছে যাতে সাধারণ কৃষকরা সহজেই এর সুবিধা নিতে পারেন।
বীমা ব্যবস্থার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| ফসলের ধরণ | প্রতি একরে সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ (সর্বোচ্চ) | প্রিমিয়ামের হার (বীমাকৃত মূল্যের ওপর) | ক্ষতির ধরণ (যা অন্তর্ভুক্ত) |
| কাউপি, মুগ ডাল, তিল, কাউন | $১৯২ (প্রায় ৬০,০০০ এলকেআর) | ৭% | খরা, বন্যা, আগুন |
| মিষ্টি আলু, কাসাভা, বাঁধাকপি | $৩২০ (প্রায় ১০০,০০০ এলকেআর) | ৭% | বন্যহাতি, পোকামাকড় |
| ধান, ভুট্টা, সয়াবিন, মরিচ | নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে উচ্চতর কভারেজ | এলাকাভেদে ভিন্ন | রোগবালাই ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ |
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে পদক্ষেপ
শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে কৃষি খাতের পুনর্গঠন অত্যন্ত জরুরি। এই বীমা প্রকল্পটি কার্যকর হলে কৃষকরা নতুন করে বিনিয়োগ করতে সাহস পাবেন। বিশেষ করে মিষ্টি আলু বা টমেটোর মতো ফসলের ক্ষেত্রে মাত্র ২২.৪০ ডলার প্রিমিয়াম দিয়ে ৩২০ ডলার পর্যন্ত সুরক্ষা পাওয়া ক্ষুদ্র চাষিদের জন্য বড় স্বস্তি। এটি কেবল একটি আর্থিক চুক্তি নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার একটি অন্যতম মাধ্যম।
AAIB-এর কর্মকর্তারা আশা করছেন, ২০২৬ সালের এই ‘বীমা মাস’ সফলভাবে সম্পন্ন হলে দেশের মোট আবাদি জমির একটি বড় অংশ বীমার আওতায় আসবে। এর ফলে ভবিষ্যতে যেকোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সরকারকে সরাসরি ভর্তুকির ওপর নির্ভর না করে বীমা ব্যবস্থার মাধ্যমেই কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হবে।
