আলোকিত মানুষেরা নীরবে আলো ছড়ান—নিজে দীপ্ত হয়ে চারপাশকে উজ্জ্বল করেন। শিক্ষাবিদ ও ভাষা সংগ্রামী প্রতিভা মুৎসুদ্দি ঠিক তেমনই এক মহীয়সী নারী, যাঁর জীবনব্যাপী সাধনা জড়িয়ে আছে শিক্ষা, মানবিকতা ও ভাষার অধিকার রক্ষার ইতিহাসের সঙ্গে। নারী শিক্ষার অগ্রদূত, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাব্রতী এবং ভাষা আন্দোলনের সাহসী সৈনিক হিসেবে তাঁর অবদান আজও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
১৯৩৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার মহামুনী পাহাড়তলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন প্রতিভা মুৎসুদ্দি। পিতা কিরণ বিকাশ মুৎসুদ্দি ছিলেন স্বনামধন্য আইনজীবী এবং মাতা শৈলবালা মুৎসুদ্দি ছিলেন স্নিগ্ধ, সত্যনিষ্ঠ এক গৃহিণী। পারিবারিক পরিবেশ থেকেই তিনি মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বোধ ও সমাজচেতনার শিক্ষা লাভ করেন।
গ্রামের পাঠশালায় শিক্ষাজীবনের সূচনা হলেও তাঁর মেধা ও অধ্যবসায় দ্রুতই তাঁকে এগিয়ে নেয়। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৫৩ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ও ১৯৫৯ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের পূর্ণতা আনতে ১৯৬০ সালে ময়মনসিংহ মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রি লাভ করেন।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ ও ভাষার দাবিতে উত্তাল সময়েই তাঁর বেড়ে ওঠা। কৈশোর থেকেই তিনি ছিলেন সচেতন ও প্রতিবাদী। চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্রী থাকাকালীন মহান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকা অবস্থায় স্বাধিকার আন্দোলনের একটি মিছিল থেকে গ্রেফতার হয়ে দু’সপ্তাহ কারাবরণ করেন—যা তাঁর সংগ্রামী জীবনের এক সাহসী অধ্যায়।
ছাত্র রাজনীতিতে তাঁর নেতৃত্ব ছিল সুস্পষ্ট। ১৯৫৫–৫৬ শিক্ষাবর্ষে ডাকসুতে মহিলা মিলনায়তন সম্পাদিকা এবং ১৯৫৬–৫৭ শিক্ষাবর্ষে রোকেয়া হলের প্রথম নির্বাচিত ভিপি হিসেবে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তবে ছাত্রজীবন শেষে ক্ষমতার রাজনীতি নয়, মানুষের জন্য কাজ করার পথ বেছে নেন তিনি।
১৯৬৩ সালে ভারতেশ্বরী হোমসে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে যোগদান এবং ১৯৬৫ সালে অধ্যক্ষার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে শুরু হয় নারী শিক্ষা বিস্তারের এক নতুন অধ্যায়। দানবীর শহীদ রণদা প্রসাদ সাহার আস্থায় তিনি টানা ৩৩ বছর দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। তাঁর নেতৃত্বে ভারতেশ্বরী হোমস ১৯৮৭ সালে স্কুল এবং ১৯৯৫ সালে কলেজ হিসেবে দেশসেরা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে।
হাজারো ছাত্রী তাঁর স্নেহ, শাসন ও প্রজ্ঞায় আত্মনির্ভরশীল মানুষ হয়ে গড়ে উঠেছে। বর্তমানে তিনি কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল লিমিটেডের পরিচালক এবং মির্জাপুর কুমুদিনী কমপ্লেক্সের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রচারবিমুখ এই মহীয়সী নারী ভাষা সৈনিক সম্মাননা, ২০০২ সালের একুশে পদক ও ২০১৭ সালের বাংলা একাডেমি ফেলোশিপে ভূষিত হয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত হলেও ভারতেশ্বরী হোমস ও কুমুদিনী ট্রাস্টই তাঁর পরিবার।
আজ তাঁর জন্মদিনে এই আলোকবর্তিকার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা ও অন্তহীন শুভকামনা।