শিশুদের সামাজিক সুরক্ষা: অস্ট্রেলিয়ার পর এবার যুক্তরাজ্যের কঠোর পদক্ষেপ

ডিজিটাল দুনিয়ার আসক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি থেকে নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপের দিকে এগোচ্ছে যুক্তরাজ্য। অস্ট্রেলিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ ‘হাউস অব লর্ডস’ ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পক্ষে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। গত বুধবার (২২ জানুয়ারি, ২০২৬) অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে লর্ড সভার সদস্যরা বিপুল ব্যবধানে এই প্রস্তাবের পক্ষে সায় দেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের ওপর কঠোর আইন প্রণয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চাপ আরও জোরালো হলো।

হাউস অব লর্ডসের ভোটাভুটি ও রাজনৈতিক সমর্থন

কনজারভেটিভ আইনপ্রণেতা জন ন্যাশের উত্থাপিত এই সংশোধনী প্রস্তাবটি হাউস অব লর্ডসে ২৬১-১৫০ ভোটে পাস হয়। মজার বিষয় হলো, ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি ও লিবারাল ডেমোক্র্যাটদের অনেক সদস্য দলীয় নীতিমালার ঊর্ধ্বে গিয়ে এই বিলের পক্ষে অবস্থান নেন। প্রস্তাবক জন ন্যাশ বলেন, “এই ভোটের মাধ্যমে পার্লামেন্ট সদস্যরা শিশুদের ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যে এক প্রজন্মকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে, তা থামানোর প্রথম ধাপ আজ শুরু হলো।”

বিভিন্ন দেশে শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা সংক্রান্ত নীতি ও পদক্ষেপ:

দেশের নামগৃহীত পদক্ষেপ ও বর্তমান অবস্থাবয়সসীমামূল উদ্দেশ্য
অস্ট্রেলিয়া১০ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর।১৬ বছরের কমসাইবার বুলিং ও মানসিক অস্থিরতা রোধ।
যুক্তরাজ্যলর্ড সভায় বিল পাস; এখন নিম্নকক্ষে যাওয়ার অপেক্ষায়।১৬ বছরের কমআসক্তি মুক্তি ও অনলাইন নিরাপত্তা।
যুক্তরাষ্ট্রবিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে মা-বাবার সম্মতি ও ট্র্যাকিং বাধ্যতামূলক।১৩-১৬ বছরডাটা সুরক্ষা ও বাণিজ্যিক প্রভাব কমানো।
ইউরোপীয় ইউনিয়নডিএসএ (DSA) আইনের অধীনে কঠোর বয়স যাচাই প্রক্রিয়া।১৫-১৬ বছরক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে সুরক্ষা।

প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের দোদুল্যমানতা ও জনচাপ

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার শিশুদের সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও আইনটি বাস্তবায়নে কিছুটা সময় নিতে চাচ্ছেন। তাঁর সরকার আগামী গ্রীষ্মকালীন পরামর্শ ও পর্যালোচনার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে তাঁর নিজ দল লেবার পার্টির অন্তত ৬০ জন এমপি স্টারমারকে এখনই নিষেধাজ্ঞা সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছেন। ডাউনিং স্ট্রিট প্রাথমিকভাবে এই সংশোধনী গ্রহণে অনাগ্রহ দেখালেও জনমতের চাপে এখন বিকল্প পথ খুঁজছে।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সংহতি

কেবল রাজনীতিবিদরাই নন, সাধারণ মানুষ ও সেলিব্রিটিরাও এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন। ব্রিটিশ চলচ্চিত্র তারকা হিউ গ্রান্টসহ অনেকেই সরকারকে অনুরোধ করেছেন যেন এই প্রস্তাবটি আইনে পরিণত করা হয়। তাঁদের মতে, শুধু মা-বাবার পক্ষে প্রযুক্তি জায়ান্টদের অ্যালগরিদমের বিরুদ্ধে লড়াই করে শিশুদের নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়। এর জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে লোহার বর্ম বা আইনি ঢাল প্রয়োজন।

জনমত ও অনলাইন সেফটি আইনের প্রেক্ষাপট

যুক্তরাজ্যে ‘ইউগভ’-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৪ শতাংশ নাগরিক শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে কার্যকর হওয়া ‘অনলাইন সেফটি আইন’ অনুযায়ী প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য বয়স যাচাই নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। তবে প্রস্তাবিত নতুন বিলটি পাস হলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কঠোর জরিমানার মুখে পড়তে হবে যদি তারা ১৬ বছরের কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দেয়।

উপসংহার

ডিজিটাল আসক্তি এখন কেবল একটি সমস্যা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক মহামারীতে পরিণত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার পর যুক্তরাজ্যের এই আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোকেও অনুপ্রাণিত করবে। হাউস অব লর্ডসে পাস হওয়া এই প্রস্তাবটি এখন নিম্নকক্ষ ‘হাউস অব কমন্সে’ যাবে। সেখানে এটি পাশ হলে যুক্তরাজ্য হবে বিশ্বের দ্বিতীয় দেশ যারা শিশুদের শৈশবকে ভার্চুয়াল জগত থেকে মুক্ত রাখার আইনি গ্যারান্টি দেবে।