ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় শিয়ালের কামড়ে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে এক নারীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা এলাকায় গভীর শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমিনা বেগম (৪৫) মারা যান। পরদিন রোববার (১৯ এপ্রিল) দুপুরে নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
মৃত আমিনা বেগম উপজেলার ধনতলা ইউনিয়নের মন্ডলপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং মো. মইনুল হকের স্ত্রী। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ মার্চ সকালে তিনি মাঠে ঘাস কাটতে গেলে একটি শিয়াল হঠাৎ তাকে আক্রমণ করে কামড় দেয়। প্রথমদিকে ঘটনাটি তেমন গুরুত্ব না পেলেও ধীরে ধীরে সেটি প্রাণঘাতী পরিস্থিতিতে রূপ নেয়।
আমিনার ছেলে আমিরুল ইসলাম জানান, ঘটনার পরপরই তার মাকে ঠাকুরগাঁও সদর আধুনিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা দুটি ডোজ ভ্যাকসিন দেন। এরপর বাড়িতে ফিরে স্থানীয় এক পল্লী চিকিৎসকের মাধ্যমে আরও দুটি ডোজ টিকা দেওয়া হয়। তবে স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক চিকিৎসা প্রক্রিয়া অনুসরণ না হওয়ায় রোগটি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, কামড়ের প্রায় ১৭ দিন পর আমিনা বেগমের শরীরে জলাতঙ্কের লক্ষণ দেখা দেয়। তার মুখ দিয়ে অনবরত লালা ঝরতে থাকে, ঘন ঘন বমি হয় এবং আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়। অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ পর্যন্ত তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাতঙ্ক একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত কুকুর, শিয়াল বা অন্যান্য বন্যপ্রাণীর কামড়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। একবার লক্ষণ প্রকাশ পেলে এ রোগ প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সম্পূর্ণ ভ্যাকসিন কোর্স গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বালিয়াডাঙ্গী এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে শিয়ালের উপদ্রব বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ভুট্টা চাষের মৌসুমে মাঠে শিয়ালের আনাগোনা বেশি দেখা যায়। ফলে কৃষিকাজ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। অনেকেই এখন একা মাঠে যেতে ভয় পাচ্ছেন; দলবেঁধে লাঠিসোঁটা নিয়ে কাজে যেতে হচ্ছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “গত বছরও শিয়ালের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল। এবারও পরিস্থিতি একই রকম। আমরা আতঙ্কে থাকি—কখন কোথা থেকে শিয়াল এসে আক্রমণ করে বলা যায় না।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাকিলা আক্তার জানান, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিনের ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা বারবার ভ্যাকসিনের চাহিদা জানালেও এখনো পর্যাপ্ত সরবরাহ পাইনি। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করছে।”
অন্যদিকে, বালিয়াডাঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বুলবুল ইসলাম জানান, শিয়ালের কামড়ে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়েছে। তবে এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
নিম্নে ঘটনাটির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নিহতের নাম | আমিনা বেগম (৪৫) |
| ঠিকানা | মন্ডলপাড়া, ধনতলা ইউনিয়ন, বালিয়াডাঙ্গী |
| কামড়ের তারিখ | ২৬ মার্চ |
| মৃত্যুর তারিখ | ১৮ এপ্রিল |
| প্রাণী | শিয়াল |
| প্রাথমিক চিকিৎসা | ৪ ডোজ (অসম্পূর্ণ) |
| লক্ষণ প্রকাশ | প্রায় ১৭ দিন পর |
| মৃত্যুস্থান | রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল |
| ভ্যাকসিন পরিস্থিতি | স্থানীয় হাসপাতালে সংকট |
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ, এবং পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর চলাচল নিয়ন্ত্রণ, সীমান্তবর্তী ও গ্রামীণ এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি এবং কৃষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি।
