রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে দীর্ঘ প্রায় চার বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে এক নতুন আশার বাণী শুনিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাথে এক ম্যারাথন বৈঠকের পর ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ এই যুদ্ধ থামবে কি না, তা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মার-এ-লাগো অবকাশযাপনকেন্দ্রে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এই ঐতিহাসিক সমঝোতার সম্ভাবনার কথা জানান। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শান্তি চুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়নে তিনি ওয়াশিংটনে ইউরোপীয় নেতাদের সাথেও বসার পরিকল্পনা করছেন।
শান্তি চুক্তির অগ্রগতি ও ট্রাম্পের প্রস্তাব
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের কণ্ঠে আশাবাদ ও সতর্কতা—উভয়ই লক্ষ্য করা গেছে। তিনি বলেন, “সবকিছু যদি ইতিবাচকভাবে এগোয়, তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে এটি দীর্ঘায়িত হতে পারে।” ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধের একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতার অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছেছে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র। শান্তি পরিকল্পনাকে ত্বরান্বিত করতে তিনি ইউক্রেনের পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পের মতে, যদি তাঁর এই পদক্ষেপ মাসে অন্তত ২৫ হাজার মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করে, তবে তিনি তা অবশ্যই করবেন।
সমঝোতার মূল বিন্দু ও অমীমাংসিত ইস্যুসমূহ
জেলেনস্কি জানিয়েছেন যে, যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছানো গেছে। তবে ট্রাম্প এ বিষয়ে কিছুটা সাবধানী অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর মতে, চুক্তির অগ্রগতি বর্তমানে ৯৫ শতাংশ পর্যায়ে রয়েছে। অবশিষ্ট ৫ শতাংশ মূলত আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি সংশ্লিষ্ট। এই প্রক্রিয়ায় ইউরোপের দেশগুলো যেন আরও বড় আর্থিক ও সামরিক দায়িত্ব পালন করে, ট্রাম্প সেই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন।
নিচে আলোচনার প্রধান দিকগুলো টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
শান্তি আলোচনার মূল রূপরেখা ও অমীমাংসিত বিষয়
| পর্যালোচনার ক্ষেত্র | বর্তমান অবস্থা ও ট্রাম্পের অবস্থান |
| চুক্তির সময়সীমা | আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চূড়ান্ত ফলাফল প্রত্যাশিত। |
| দনবাস অঞ্চল | এটি এখনও অমীমাংসিত; রাশিয়া পূর্ণ দখল চায়, ইউক্রেন নারাজ। |
| নিরাপত্তা নিশ্চয়তা | ৯৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে; ইউক্রেন দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা চায়। |
| পুতিনের অবস্থান | ৬০ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন পুতিন। |
| ইউরোপের ভূমিকা | শান্তি রক্ষায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে বড় দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান। |
দনবাস সংকট ও পুতিনের সাথে আলাপ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে দনবাস অঞ্চল। মস্কোর অনড় দাবি, দনবাসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কিয়েভকে ছেড়ে দিতে হবে। ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাবেও দনবাসকে রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত থাকলেও জেলেনস্কি এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নমনীয়তা আশা করছেন। ট্রাম্প ও জেলেনস্কি উভয়েই স্বীকার করেছেন যে, দনবাস ইস্যুটি অত্যন্ত জটিল এবং এটি এখনও সমাধানের অপেক্ষায়।
উল্লেখ্য যে, জেলেনস্কির সাথে বৈঠকের আগে ট্রাম্প ফোনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে কথা বলেন। ট্রাম্প সেই আলাপকে ‘ফলপ্রসূ’ বললেও ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পুতিন ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। পুতিনের মতে, কোনো বিলম্ব ছাড়াই কিয়েভকে দনবাস ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ট্রাম্পের এই মধ্যস্থতা এখন এক অগ্নিপরীক্ষা। যদি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়, তবে তা বিশ্ব রাজনীতিতে ট্রাম্পের এক বিশাল কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে গণ্য হবে। জেলেনস্কির সাথে আলোচনার পর ট্রাম্প আবারও পুতিনের সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে হোয়াইট হাউস এখন এই যুদ্ধ বন্ধে মরিয়া।
