শহীদ পরিবার ও খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা বৃদ্ধি

দেশের সূর্যসন্তানদের সম্মাননা বৃদ্ধি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। রবিবার (২৫ জানুয়ারি, ২০২৬) অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ৩২তম সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়। সভায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানি ভাতা একলাফে ৫ হাজার টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে এসব পরিবার প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকার পরিবর্তে ২৫ হাজার টাকা হারে রাষ্ট্রীয় ভাতা লাভ করবেন।

জুলাই বিপ্লবের শহীদদের জন্য নতুন স্বীকৃতি

এই সভায় একটি ঐতিহাসিক সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া পরিবার এবং আহতদের মাসিক সম্মানি ভাতাকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আত্মদানকারীদের পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় আর্থিক সুরক্ষা ও মর্যাদার স্তরে অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ভাতার সংশোধিত তালিকা:

কর্মসূচির নামবর্তমান উপকারভোগীপরিবর্তিত মাসিক ভাতার হার
শহীদ ও খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাসকল তালিকাভুক্ত পরিবার২৫,০০০ টাকা (৫,০০০ টাকা বৃদ্ধি)
বয়স্ক ভাতা৬২ লাখ ব্যক্তি৭০০ টাকা (৯০ ঊর্ধ্বদের ১০০০ টাকা)
বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা২৯ লাখ নারী৭০০ টাকা (৯০ ঊর্ধ্বদের ১০০০ টাকা)
প্রতিবন্ধী ভাতা৩৬ লাখ ব্যক্তি৯০০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকা
মা ও শিশু সহায়তা১৮.৯৫ লাখ মা৮৫০ টাকা
অনগ্রসর জনগোষ্ঠী২.২৮ লাখ ব্যক্তি৭০০ টাকা
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি৬০ লাখ পরিবার১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি চাল

সমাজকল্যাণ ও শিক্ষা উপবৃত্তিতে বিশেষ নজর

সরকার বয়স্ক ও বিধবা ভাতার ক্ষেত্রে বয়সের ভিত্তিতে একটি নতুন বৈষম্যহীন কাঠামো দাঁড় করিয়েছে। বর্তমানে ৫৯ লাখ ৯৫ হাজার বয়স্ক ব্যক্তি মাসিক ৬৫০ টাকার পরিবর্তে ৭০০ টাকা পাবেন। তবে প্রবীণদের সম্মানার্থে ৯০ বছরের বেশি বয়সী ২ লাখ ৫ হাজার নাগরিকের ভাতা ১ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সকল স্তরের বৃত্তির হার ৫০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির হার স্তরভেদে ৭০০ টাকা থেকে ১,২০০ টাকা পর্যন্ত পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্বিগুণ বরাদ্দ ও খাদ্য নিরাপত্তা

ক্যান্সার, কিডনি ও লিভার-সিরোসিসের মতো ব্যয়বহুল ও প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য সরকার বড় ধরণের স্বস্তির খবর দিয়েছে। এই খাতে এককালীন আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ১ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। একইসাথে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৬৫ হাজার করা হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’র আওতায় আরও ৫ লাখ নতুন পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যার ফলে মোট ৬০ লাখ পরিবার সুলভ মূল্যে খাদ্যশস্য সহায়তা পাবে। এছাড়া দেশের জেলে সম্প্রদায়ের জন্য ১৫ লাখ ব্যক্তিকে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় এনে তাদের জীবনমান উন্নয়নের পথ সুগম করা হয়েছে।

উপসংহার

অর্থ উপদেষ্টার নেতৃত্বে গৃহীত এই সিদ্ধান্তগুলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কাঠামোকে আরও মানবিক ও জনমুখী করে তুলবে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনার প্রস্তাবটি সরকারের বৈপ্লবিক সংস্কারের একটি প্রতিফলন। এই বর্ধিত ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা দেশের কোটি মানুষের অভাবী জীবনে নতুন করে আশার আলো সঞ্চার করবে এবং সামাজিক বৈষম্য হ্রাসে সহায়ক হবে।