বিজয় দিবস মানেই বাঙালির গর্ব, আত্মত্যাগ ও বিজয়ের স্মরণ। অথচ সেই বিজয়ের আগের রাতে শরীয়তপুরের নিয়ামতপুর গ্রামে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক ও লজ্জাজনক ঘটনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সৈনিক আ. মান্নান খানের কবরের ওপর আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যা স্থানীয়ভাবে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
আ. মান্নান খান ছিলেন ১৯৭১ সালের একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা, যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। মৃত্যুর পরও তিনি ছিলেন গ্রামবাসীর কাছে সম্মানের প্রতীক। তার কবরটি বাড়ির পাশে হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত সেখানে যেতেন। সেই পবিত্র স্থানেই আগুন দেওয়ার ঘটনা যেন পরিবারের ওপর দ্বিতীয়বার আঘাত হয়ে এসেছে।
স্বামীহারা মাহফুজা বেগম প্রতিদিন সকালে স্বামীর কবর জিয়ারত করেন। ঘটনার দিন সকালে তিনি সেখানে গিয়ে আগুনের চিহ্ন দেখতে পান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, তার স্বামীর জন্য শুধু পরিবার নয়, পুরো গ্রাম গর্বিত ছিল। এমন অপমান তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। বিজয়ের দিনে যেখানে আনন্দ থাকার কথা, সেখানে পুরো পরিবার শোকে ভেঙে পড়েছে।
এই ঘটনার সামাজিক ও মানসিক দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি কবর শুধু মৃত ব্যক্তির নয়, বরং ইতিহাস, স্মৃতি ও সম্মানের প্রতীক। বিশেষ করে যখন সেই ব্যক্তি একজন মুক্তিযোদ্ধা, তখন তার কবরের ওপর আঘাত স্বাধীনতার চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। স্থানীয়রা মনে করছেন, এটি নিছক ব্যক্তিগত আক্রোশ নয়; বরং এর পেছনে গভীর কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
ঘটনার পরপরই মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও প্রশাসনের মধ্যে যোগাযোগ হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করা হবে। জেলা প্রশাসনও পুলিশ সুপারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
তবে প্রশাসনিক আশ্বাসের বাইরেও মানুষের মনে যে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো—আমরা কি এখনো আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষা করতে পারছি? স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি সময় পরও যদি একজন মুক্তিযোদ্ধার কবর নিরাপদ না থাকে, তবে তা সমাজের জন্য অশনিসংকেত।
এই ঘটনার দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যাবে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।