লাতিন বাংলা সুপার কাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা ঘিরে বহুদিন ধরেই বাংলাদেশের ফুটবল অঙ্গনে উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের দুটি ক্লাবের মধ্যে অনূর্ধ্ব–২০ দলের লড়াই ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু শৃঙ্খলা ভঙ্গ, আর্থিক অসঙ্গতি এবং নিরাপত্তা ব্যত্যয়ের অভিযোগে টুর্নামেন্টটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় জাতীয় স্টেডিয়ামে পরবর্তী ম্যাচ স্থগিত করে পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেয়।
সরকারি আদেশে বলা হয়, আয়োজক প্রতিষ্ঠান এএফবি বক্সিং প্রমোশন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড স্টেডিয়াম ব্যবহারের মূল শর্তগুলো মানতে ব্যর্থ হয়েছে। শর্ত অনুযায়ী টিকিট বিক্রির সম্পূর্ণ হিসাব এবং তার ৫০ শতাংশ অর্থ ম্যাচ শুরুর পূর্বেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অনুকূলে জমা দিতে হতো। কিন্তু দুই ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার পরও আয়োজকরা কোনো সঠিক আর্থিক বিবরণী জমা দেয়নি। টিকিট মূল্য, বিক্রি হওয়া সংখ্যা, আয়ের পরিমাণ—কোনোটিই স্বচ্ছ ছিল না। আরও বড় সমস্যা দেখা দেয় স্পনসরশিপ এবং সম্প্রচার স্বত্বের হিসাব নিয়ে। আয়োজকদের দেওয়া সকল প্রতিশ্রুতি ছিল অস্পষ্ট, এমনকি বারবার অনুরোধের পরও তারা সংশ্লিষ্ট নথি বা চুক্তির কোনো তথ্য জমা দেয়নি।
অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার অভাবের পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি পুরো পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। গত সোমবার রাতে স্টেডিয়ামে ম্যাচ চলাকালে বেসরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন কর্মী একজন ক্রীড়া সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ চালায়। তার মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়, এমনকি মারধর করারও অভিযোগ ওঠে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাকে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয় উল্লেখ করে। ৮ ডিসেম্বরের ম্যাচেও একাধিক সাংবাদিককে হয়রানির শিকার হতে হয়—এমন অভিযোগও উঠে আসে। স্পষ্টতই আয়োজকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল দুর্বল ও অগোছালো।
এ অবস্থায় ১১ ডিসেম্বরের ম্যাচ স্থগিত করে মন্ত্রণালয় নির্দেশ দেয়, ৯ ডিসেম্বর বিকেল ৪টার মধ্যে আয়োজকদের অবশ্যই ৫ ও ৮ ডিসেম্বরের ম্যাচের টিকিট বিক্রির পূর্ণাঙ্গ বিবরণী, স্পনসরশিপ ও সম্প্রচার স্বত্বের হিসাব এবং তার ৫০ শতাংশ অর্থ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হবে। নির্দেশ অমান্য করলে পুরো টুর্নামেন্টই বাতিল হতে পারে—এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।
এদিকে ফুটবল বিশ্বে আলোড়ন তোলা দুই কিংবদন্তি—কাফু এবং ক্লদিও ক্যানিজিয়াকে ঢাকায় আনার ঘোষণা দিয়েছিল আয়োজক প্রতিষ্ঠান। তাদের আগমন বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য ছিল বড় আকর্ষণ। কিন্তু টুর্নামেন্টের অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এখন তাঁদের আগমনও ঝুলে গেছে। পেশাদারিত্বহীনতা, আর্থিক অস্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা ব্যত্যয়—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কি আন্তর্জাতিক মানের এমন আয়োজন করতে প্রস্তুত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্লাবগুলোকে বাংলাদেশে আনার ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতার বড় সংকট তৈরি হবে। আয়োজকদের ভুল ব্যবস্থাপনা পুরো দেশের ফুটবলের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে অনেকে মনে করছেন। পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত, এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী আয়োজকরা সময়মতো হিসাব জমা না দিলে বৃহৎ এই আয়োজন পুরোপুরি বাতিল হয়ে যেতে পারে।
