জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র দিয়ে গুলি, ফটিকছড়িতে মোবারক গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে পুলিশের অভিযানে মোবারক নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, অভিযানের সময় মোবারক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে পরপর ছয়টি গুলি ছোড়েন। পরে তাঁর ব্যবহৃত পিস্তল পরীক্ষা করে পুলিশ জানতে পারে, সেটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মোবারক ফটিকছড়ি ও রাউজান এলাকার একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। কারাগারে থাকা সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদ হত্যাসহ একাধিক অপরাধে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ জানায়, দীর্ঘদিন ধরে ফটিকছড়ির দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন মোবারক। তাঁকে গ্রেপ্তারে সেখানে একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও সফলতা মেলেনি। পরে পাহাড়ি এলাকায় পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো হলে তিনি ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর এলাকায় পরিচিত এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নেন।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার গভীর রাতে পুলিশ ওই বাড়িতে অভিযান চালায়। রাত তিনটার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বাড়িটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। বাড়ির মূল দরজা ছিল লোহার তৈরি। দীর্ঘ সময় ধরে দরজা খোলার জন্য ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের বলা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে ভোর সাড়ে চারটার দিকে দরজা ভেঙে পুলিশ বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।

অভিযানকারী দল প্রথমে বাড়ির একটি ওয়াশরুমের ওপরের কৃত্রিম ছাদে মোবারকের তিন সহযোগীর অবস্থান শনাক্ত করে। তাঁদের একে একে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিরা হলেন মো. রায়হান, মো. ফরিদ ও মো. নাছির। তাঁদের কাছ থেকে তিনটি পিস্তল, পিস্তলের ২৩টি গুলি এবং শটগানের চারটি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এরপর বাড়ির আরেকটি কক্ষের ওয়াশরুমের কৃত্রিম ছাদে মোবারকের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পুলিশ সদস্যরা কক্ষে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করেন বলে পুলিশের দাবি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোবারক পরপর ছয়টি গুলি ছোড়েন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়।

এ সময় একটি গুলি চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজের কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। গোলাগুলির ঘটনায় পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। আহতদের মধ্যে ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ, ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিউল আলম খান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের দেহরক্ষী মামুনুর রশিদ এবং ফটিকছড়ি থানার পুলিশ সদস্য শাহ নেওয়াজ ও সাদ্দাম হোসেন। তাঁরা পরে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।

পুলিশের দাবি, মোবারক সপ্তমবার গুলি করার চেষ্টা করলে তাঁর পিস্তলটি আটকে যায়। সেই সুযোগে অভিযানকারী সদস্যরা তাঁকে কৃত্রিম ছাদ থেকে নামিয়ে গ্রেপ্তার করেন। পরে তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার করা পিস্তল পরীক্ষা করে অস্ত্রটির পরিচয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। পুলিশ জানায়, এটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র।

মোবারক গ্রেপ্তারের পর ফটিকছড়ি ও রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান শুরু করে জেলা পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করায় মোবারককে গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান করার কারণে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান পরিচালনাতেও নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা ছিল।

পুলিশ আরও দাবি করেছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদ হত্যাসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তবে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া বক্তব্যই কোনো অভিযোগের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। এসব অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ জানান, অস্ত্র লুট এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। ওই দুই মামলায় মোবারককে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়। পরে আদালত দুই মামলায় চার দিন করে মোট আট দিনের হেফাজত মঞ্জুর করেন।

পুলিশের এই অভিযানকে কেন্দ্র করে ফটিকছড়ি ও রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মোবারকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটিতে আতঙ্কের পরিবেশ ছিল। তাঁর গ্রেপ্তারের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।

অস্ত্র লুটের ঘটনার পর সেই অস্ত্রের একটি পুলিশের ওপর হামলায় ব্যবহারের অভিযোগও বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও গুলির উৎস, মোবারকের সঙ্গে তাঁর সহযোগীদের সম্পর্ক এবং তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর