সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন। রোববার (১১ অক্টোবর) বিমানবন্দরের ৪ নম্বর টার্মিনালে চালানো এ হামলার পর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় সৌদি আরবে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
ইয়েমেনের সংঘাতে জড়িত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, রিয়াদের বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর টার্মিনাল এলাকায় আগুন ধরে যায়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। এর আগের দিন, শনিবার (১০ অক্টোবর), সৌদি আরবে আরেকটি হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি মানুষ আহত হন বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই দিনের হামলায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় দেশটির সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব হামলাকে গত এক দশকের মধ্যে সৌদি আরবে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাগুলোর অন্যতম হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ধারাবাহিক আক্রমণের ফলে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, বিমান চলাচল এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার দাবি
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রিয়াদের আকাশে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে একটি ড্রোন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে।
সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আভাতেও কিছু সময়ের জন্য জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়। এসব ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে, নিরাপত্তা উদ্বেগ শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্ভাব্য আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
এদিকে, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচলকেন্দ্র কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলার খবর নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। দাম্মামে অবস্থিত এ বিমানবন্দরে ঘটনার পর বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বিলম্বিত ও বাতিল হয়েছে। ফলে যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি বিমান চলাচলের স্বাভাবিক সূচিও ব্যাহত হয়েছে।
বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি যাত্রীদের চলাচল ও ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হচ্ছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে বিমান চলাচলে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজন হতে পারে। তবে এ বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্তের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
হামলার দায় স্বীকার হুতিদের
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি শনিবার ও রোববারের হামলাগুলোর দায় স্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, রিয়াদ ও দাম্মামের বিমানবন্দরের পাশাপাশি সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর দুটি স্থাপনাও হামলার লক্ষ্য ছিল।
হুতিদের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আক্রমণ চালানো হতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সাধারণ মানুষকে দেশটির বিমানবন্দরগুলো ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছে গোষ্ঠীটি।
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে বিরোধের পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত। ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক ভূমিকা এবং হুতিদের পাল্টা হামলা বহু বছর ধরেই আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ব্যবহার এই সংঘাতকে ইয়েমেনের সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
তবে সংঘাতে জড়িত কোনো পক্ষের দেওয়া বক্তব্যকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি। বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোতে হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি এবং সব হতাহতের বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।
সৌদি-ইয়েমেন সংকটে মধ্যস্থতায় প্রস্তুত ইরান
ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কায় কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে মধ্যস্থতার উদ্যোগে তেহরান প্রস্তুত রয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে মধ্যস্থতার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে সহায়তা করার বিষয়টি বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সম্ভাব্য সহায়তার ধরন বা পরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের নাগরিকদের সৌদি আরবে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার ঝুঁকির কারণে ভ্রমণকারীদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ এবং ফ্লাইটের সর্বশেষ তথ্য জেনে চলার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।
রিয়াদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস
নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় সৌদি সরকার রিয়াদের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পর্যন্ত সরাসরি পাঠদান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সময় শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস চালু থাকবে।
এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে পড়া থেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেও রিয়াদে নির্ধারিত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সৌদি আরব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি হওয়ায় দেশটির জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। সৌদি আরামকোর স্থাপনায় হামলার দাবি এ কারণে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তবে ওই স্থাপনাগুলোতে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
ধারাবাহিক হামলা সৌদি আরবের জননিরাপত্তা, বিমান চলাচল ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা কমানোর প্রয়োজনীয়তাও বাড়িয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে এগোবে, তা নির্ভর করছে ভবিষ্যতে আরও হামলা ঘটে কি না, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সামরিক পদক্ষেপ কী হয় এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে এগোয় তার ওপর। আপাতত নিরাপত্তা জোরদার, নাগরিকদের সুরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সচল রাখাই সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রধান চ্যালেঞ্জ।









