হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করেন, তাঁদের বাহিনী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ‘সুনির্দিষ্ট’ হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহনের পাম্পিং স্টেশনগুলো লক্ষ্য করে কয়েকটি ড্রোন হামলা চালানোর কথাও জানান তিনি।
তবে এসব হামলার দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। বিমানবন্দর কিংবা তেল পরিবহনের স্থাপনাগুলোতে হামলার ফলে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, সে বিষয়েও তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, রিয়াদের দিকে ধেয়ে আসা হুতিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা পর বিমানবন্দরে হামলার দাবি করে হুতিরা। তবে সৌদি বাহিনীর প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্রটির সঙ্গে পরবর্তী দাবির কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, ইয়েমেনে অভিযান পরিচালনাকারী সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তারা সানায় দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। এসব স্থাপনায় হামলার পর কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। হতাহতের কোনো তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি।
Table of Contents
সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার দাবি
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর আগে রোববারও সৌদি আরবের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছিল হুতিরা। তাদের দাবি অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমানঘাঁটি এবং জিজানের একটি নৌঘাঁটি।
একই সময়ে হুতিরা অভিযোগ করে, গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৫৬টি বিমান হামলা চালিয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হোদেইদাহ, লাহজ, আমরান, সাহদা, আল-জওফ, তাইজ ও ইব প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব হামলা চালানো হয়।
তবে হামলার সংখ্যা, লক্ষ্যবস্তু ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। সৌদি জোটের পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা সব হামলার বিস্তারিত বিবরণ তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগের শনিবার সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে সাতটি হামলা চালানোর দাবি করেছিল হুতিরা। ধারাবাহিক এসব দাবির মধ্য দিয়ে গোষ্ঠীটি সৌদি ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানার সক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা যায়। তবে তাদের ঘোষিত অভিযানের প্রকৃত ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনও সীমিত।
সৌদি আরবের জন্য বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি ও তেল পরিবহনের অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব স্থাপনায় হামলা হলে বেসামরিক বিমান চলাচল, সামরিক কার্যক্রম এবং জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থাকে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর কারণে সৌদি আরবের তেল উৎপাদন বা সরবরাহে কোনো প্রভাব পড়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ
সৌদি আরবের অভিযোগ, হুতিরা পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে হুতিরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে হামলার প্রকৃত লক্ষ্য ও পরিণতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ইয়েমেনের সংঘাত দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। হুতিরা দেশটির রাজধানী সানা ও উত্তর ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করেছে।
এই সংঘাতের ধারাবাহিকতায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাল্টাপাল্টি দাবি নতুন করে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে কেন্দ্র করে সামরিক তৎপরতা বাড়লে সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর উত্তেজনার মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, সেদিন কোনো হামলা হবে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন করে চালানো হামলা আগের হামলাগুলোর মতোই ভিন্ন কোনো ফল বয়ে আনবে না। তাঁর বক্তব্যে তেহরানের পক্ষ থেকে সামরিক পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ পেয়েছে।
এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরান সফর করেছেন। এই সফরের বিস্তারিত ফলাফল সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানা যায়নি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
ইয়েমেনে সৌদি জোট ও হুতিদের পাল্টাপাল্টি হামলার দাবি এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা—দুই পরিস্থিতিই আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে জটিল করে তুলছে। কোনো একটি সংঘাতের বিস্তার অন্য অঞ্চলের পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
গাজা ও পশ্চিম তীরেও সহিংসতা অব্যাহত
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত আটজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরের সব প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করে রাখার পাশাপাশি হেবরন শহরেও অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
গাজা ও পশ্চিম তীরের এসব ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। একদিকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সহিংসতা, অন্যদিকে ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এবং ইরানকে ঘিরে সংঘাতের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে অঞ্চলটির পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার দাবি এবং সানায় সৌদি জোটের পাল্টা অভিযানের প্রকৃত প্রভাব এখনও স্পষ্ট নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি, আর ইয়েমেনে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোতে হামলার ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্যও প্রকাশিত হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের ওপরই পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র নির্ভর করছে।









