রিজার্ভ চুরির তদন্ত ফের বিলম্বিত

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ চুরির ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় আবারও পিছিয়েছে। তদন্ত সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) নির্ধারিত তারিখে প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় আদালত নতুন করে আগামী ১৮ মে তারিখ ধার্য করেছেন।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য থাকলেও কোনো প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম সময় বাড়ানোর নির্দেশ দেন এবং নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনার পটভূমি ও অর্থ চুরির ঘটনা

২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে সংরক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব থেকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সুইফট বার্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে জালিয়াতি করে অর্থ স্থানান্তর করে। ওই ঘটনায় মোট ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয়, যা পরে ফিলিপাইনের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয় বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

ধারণা করা হয়, আন্তর্জাতিক হ্যাকার চক্রের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরের কোনো একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর সহায়তায় এই অর্থ স্থানান্তরের জালিয়াতি সম্পন্ন করা হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

মামলা ও তদন্তের অগ্রগতি

ঘটনার পর ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস ও বাজেটিং বিভাগের তৎকালীন উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। এতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনসহ বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

পরবর্তীতে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি)। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন এখনো চূড়ান্তভাবে আদালতে জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তদন্তের সময়রেখা

নিচে রিজার্ভ চুরির ঘটনা ও মামলার প্রধান অগ্রগতির একটি সংক্ষিপ্ত সময়রেখা দেওয়া হলো—

তারিখঘটনা
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি
১৫ মার্চ ২০১৬মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের
২০১৬ সালের পরবর্তী সময়তদন্তভার সিআইডির কাছে হস্তান্তর
বিভিন্ন তারিখএকাধিকবার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় পেছানো
৯ এপ্রিল ২০২৬নির্ধারিত তারিখে প্রতিবেদন জমা হয়নি
১৮ মে ২০২৬নতুন করে প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ নির্ধারণ

বর্তমান পরিস্থিতি ও গুরুত্ব

এই ঘটনা শুধু একটি অর্থ চুরির মামলা নয়, বরং দেশের ব্যাংকিং নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক লেনদেন প্রযুক্তি এবং সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে। ঘটনার প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ না হওয়ায় জনমনে ধীরগতি ও জবাবদিহি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে ভবিষ্যতে আর্থিক খাতে আস্থা সংকট তৈরি হতে পারে। এখন সকলের নজর আগামী ১৮ মে’র দিকে, যখন তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।