খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৪:৫৬ এএম

রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে সুরের মূর্ছনায় ভেসে এলো একটি কাঙ্ক্ষিত শব্দ—‘বাংলাদেশ’। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত পৌনে বারোটা। জাতীয় সংসদ ভবনের সম্মুখভাগে তিলধারণের ঠাঁই নেই। মঞ্চে রকস্টার জেমস তার ষষ্ঠ গান শেষ করে সপ্তম গানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আচমকা ড্রামার ফান্টির দিকে ইশারা করতেই বেজে উঠল সেই চেনা গিটার ইন্ট্রো। প্রিন্স মাহমুদের কালজয়ী কথা ও সুরে জেমস গাইলেন—‘তুমি বঙ্গবন্ধুর রক্তে আগুনে জ্বলা জ্বালাময়ী সে ভাষণ / তুমি ধানের শিষে মিশে থাকা শহীদ জিয়ার স্বপন’। দীর্ঘ বিরতির পর প্রিয় শিল্পীর কণ্ঠে দেশের গান শুনে হাজারো দর্শকের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশে গত কয়েক মাস বড় কোনো কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়নি। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের মাহেন্দ্রক্ষণ উদযাপন করতে আয়োজন করা হয় বিশেষ কনসার্ট ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক স্থবিরতা ভেঙে এই আয়োজনটি সংগীতপ্রেমীদের জন্য এক পশলা বৃষ্টির মতো কাজ করেছে। খোলা আকাশের নিচে হাজারো কণ্ঠের সমস্বরে গাওয়ার এই দৃশ্য যেন এক নতুন ভোরের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
একনজরে কনসার্টের মূল আকর্ষণ ও পারফরম্যান্স:
| শিল্পী/ব্যান্ডের নাম | উল্লেখযোগ্য পরিবেশনা | বিশেষ মুহূর্ত |
| শিরোনামহীন | হাসিমুখ, বন্ধ জানালা, এই অবেলায় | হাজারো মোবাইল ফোনের আলোয় এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি। |
| জেফার রহমান | ঝুমকা, ঝিলমিল | রাফসান সাবাবের উপস্থাপনায় দর্শকদের নাচে মাতিয়ে তোলা। |
| ওয়ারফেজ | পূর্ণতা, অবাক ভালোবাসা, অসামাজিক | হার্ড রক রিফ ও ড্রাম বিটে উন্মাতাল করা পারফরম্যান্স। |
| জেমস ও নগরবাউল | কবিতা, মা, বাংলাদেশ, পাগলা হাওয়া | ‘বাংলাদেশ’ গানটি গাওয়ার মাধ্যমে আবেগের চরম বহিঃপ্রকাশ। |
কনসার্টের শুরু থেকেই দর্শকদের মধ্যে ছিল উপচে পড়া আবেগ। রাত সাড়ে আটটার দিকে যখন জনপ্রিয় ব্যান্ড শিরোনামহীন মঞ্চে ওঠে, তখন পুরো চত্বর যেন এক বিশাল গায়কদলে পরিণত হয়। ‘হাসিমুখ’ গানের সুর যখন আকাশে ভাসছিল, তখন হাজার হাজার মানুষ তাদের ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে দুলতে থাকেন। এরপর পপ আইকন জেফার রহমান তার স্টাইলিশ স্টেজ প্রেজেন্স দিয়ে দর্শকদের নাচে মাতিয়ে রাখেন। সম্প্রতি বিবাহিত জেফার ও উপস্থাপক রাফসান সাবাবকে একই মঞ্চে দেখে দর্শকদের মধ্যে বাড়তি উন্মাদনা লক্ষ্য করা যায়।
রাত পৌনে দশটায় মঞ্চে আসে কিংবদন্তি রক ব্যান্ড ওয়ারফেজ। তাদের ‘পূর্ণতা’ ও ‘অবাক ভালোবাসা’ গানের সময় পুরো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এক সুরে কণ্ঠ মেলায়। ভারী গিটার রিফ আর রক মিউজিকের দাপটে শীতের রাতও যেন তপ্ত হয়ে ওঠে।
রাত ১১টায় মঞ্চে আরোহণ করেন জেমস। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি ভক্তদের জন্য গেয়ে চলেন একের পর এক হিট গান। কাশির সমস্যা থাকায় তাকে বারবার গরম পানিতে আদা মিশিয়ে খেতে দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু তার কণ্ঠের জাদুতে তা বোঝার উপায় ছিল না। ভক্তদের উদ্দেশে তিনি পরম মমতায় বলেন, ‘তোমরা যত দিন আছ, আমি আছি। তোমরাই আমার জান।’ দীর্ঘদিন গুঞ্জন ছিল যে রাজনৈতিক কারণে ‘বাংলাদেশ’ গানটি গাওয়ায় অলিখিত বাধা রয়েছে। তবে সব জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে জেমস প্রমাণ করলেন, শিল্পী ও তার সৃষ্টি চিরকালই স্বাধীন। গানটির মধ্য দিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শহীদ জিয়াউর রহমানসহ জাতীয় নেতাদের স্মরণ করেন, যা উপস্থিত জনতার মনে এক নতুন ঐক্যের ডাক দিয়ে যায়। রাত ঠিক বারোটায় ‘আসবার কালে আসলাম একা’ গানটি দিয়ে পর্দা নামে এই স্মরণীয় আয়োজনের। এই কনসার্টটি কেবল একটি সংগীত উৎসব ছিল না, এটি ছিল সংস্কৃতির পথে বাংলাদেশের পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর এক বলিষ্ঠ শপথ।
মন্তব্য