খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই নভেম্বর ২০২৫, ৪:৩৬ পিএম

রাজশাহী মহানগরীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া পদ্মা পাড়ের শান্ত শহরটি গত বৃহস্পতিবার এক হাড়হিম করা নৃশংসতার সাক্ষী হয়েছে। মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আব্দুর রহমানের তরুণ পুত্র তাওসিফ রহমান সুমনকে (১৯) নিজ বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় উত্তাল এখন পুরো রাজশাহী। এই চাঞ্চল্যকর মামলার প্রধান অভিযুক্ত লিমন মিয়াকে (৩৫) পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। শনিবার (১৫ নভেম্বর) দুপুরে এই আদেশ প্রদানের মাধ্যমে মামলাটি এক নতুন মোড় নিয়েছে।
Table of Contents
গত ১৩ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজশাহী নগরের ডাবতলা এলাকায় এক ভাড়া বাসায় এই বর্বরোচিত হামলা সংঘটিত হয়। বিচারকের ছেলে তাওসিফকে হত্যার পর ঘাতক লিমন মিয়া পালানোর চেষ্টা করলেও সে সময় সে নিজেও আহত হয়। একই হামলায় গুরুতর আহত হন সুমনের মা তাসমিন নাহার লুসী। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত লিমন পুলিশি পাহারায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল।
শনিবার দুপুরে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে লিমনকে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-১-এ হাজির করা হয়। রাজশাহী মেট্রোপলিটন কোর্ট ইন্সপেক্টর আবদুর রফিক জানান, মামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে পুলিশ লিমনের ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল। তবে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক মামুনুর রশিদ ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র ও মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন বিকেলে লিমন মিয়া অতর্কিতে বিচারক আব্দুর রহমানের বাসায় প্রবেশ করে। সে সময় বাসায় সুমন ও তাঁর মা উপস্থিত ছিলেন। ঘাতক অত্যন্ত ধারালো অস্ত্র দিয়ে সুমনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করতে থাকে। সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে মা তাসমিন নাহার লুসীও গুরুতর জখম হন। সুমনের চিৎকারে আশপাশের মানুষ এগিয়ে এলে ঘাতক লিমন নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টাকালে আহত হয়।
পরবর্তীতে স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করে দ্রুত রামেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সুমনকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনার পরদিন শুক্রবার বিকেলে নিহতের পিতা বিচারক মোহাম্মদ আব্দুর রহমান বাদী হয়ে রাজপাড়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ হাসপাতাল থেকেই লিমনকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আইনানুগ প্রক্রিয়া শুরু করে।
হত্যাকাণ্ড এবং এর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| নিহতের পরিচয় | তাওসিফ রহমান সুমন (১৯), বিচারক আব্দুর রহমানের ছেলে। |
| প্রধান অভিযুক্ত | লিমন মিয়া (৩৫), পিতা- এইচ এম সোলায়মান শহীদ। |
| অভিযুক্তের স্থায়ী ঠিকানা | গ্রাম- মদনেরপাড়া, থানা- ফুলছড়ি, জেলা- গাইবান্ধা। |
| ঘটনার স্থান ও তারিখ | ডাবতলা এলাকা, রাজশাহী; ১৩ নভেম্বর ২০২৫। |
| আহত ব্যক্তিগণ | নিহতের মা তাসমিন নাহার লুসী এবং অভিযুক্ত লিমন মিয়া। |
| মামলার বিবরণ | রাজপাড়া থানায় নিহতের পিতার দায়ের করা হত্যা মামলা। |
| আদালতের আদেশ | ৫ দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর। |
নিহত তাওসিফ রহমান সুমনের অকাল মৃত্যুতে তাঁর পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে শোকের মাতম চলছে। ময়না তদন্ত শেষে শুক্রবার সকালে সুমনের মরদেহ তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেদিন দুপুরেই অ্যাম্বুলেন্সযোগে তাঁর নিথর দেহ নিয়ে যাওয়া হয় পৈতৃক নিবাস জামালপুরে। সেখানে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। মেধাবী এই তরুণের এমন মৃত্যুতে সহপাঠী ও পরিচিত মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিচারক পিতার একমাত্র পুত্রের এই করুণ পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তাঁর পরিজনরা।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লিমন মিয়া কেন এবং কার ইশারায় একজন উচ্চপদস্থ বিচারকের বাসায় ঢুকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে জানার চেষ্টা করা হবে। এটি কোনো পূর্বশত্রুতার জের নাকি বিচারকের পেশাগত জীবনের কোনো রায়ের কারণে সৃষ্ট আক্রোশ, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মহানগরীর সচেতন নাগরিক সমাজ এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, যদি একজন বিচারকের পরিবারের সদস্যরাই নিজ বাসায় নিরাপদ না থাকেন, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিশেষ করে দিনের আলোতে জনাকীর্ণ এলাকায় এমন দুঃসাহসিক হামলা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, রিমান্ড চলাকালীন অভিযুক্তের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী অভিযান পরিচালনা করা হবে। কোনো প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। জনমনে শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে এই মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
পরিশেষে বলা যায়, তাওসিফ রহমান সুমন হত্যার এই বিচারপ্রক্রিয়া কেবল একটি পরিবারের বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এটি অপরাধীদের জন্য একটি কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে। সমাজ প্রত্যাশা করে, ৫ দিনের এই রিমান্ডের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসবে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা প্রকৃত রহস্য।
মন্তব্য