বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিত্ব শেখ হাসিনা। দীর্ঘ পথপরিক্রমা, উত্থান-পতন, সাফল্য ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে কাটানো তাঁর জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। জন্মলগ্নে যে শিশুর আগমন ঘটেছিল দেশের এক অবিসংবাদিত নেতার ঘরে, কালক্রমে তিনি নিজেও হয়ে উঠেছিলেন দেশের দীর্ঘতম সময় শাসন করা রাষ্ট্রপ্রধান।
১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে জন্মগ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে রাজনীতির আবহেই তাঁর বেড়ে ওঠা। জীবনের শুরু থেকেই রাজনৈতিক ওঠানামা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস ট্র্যাজেডিতে পরিবারের প্রায় সবাইকে হারিয়ে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছিল তাঁকে। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে দেশে ফিরে দলের হাল ধরেন তিনি। সেই থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত টানা চার দশকেরও বেশি সময় তিনি ছিলেন দেশের রাজনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি।
দীর্ঘ শাসনের এই পথপরিক্রমায় অর্জন ও সাফল্য যেমন রয়েছে, তেমনি সঙ্গী হয়েছে নানা বিতর্ক ও কঠোর সমালোচনাও। ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তাঁর আমলে বাংলাদেশ মেগা অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সূচকে বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখ দেখেছে। পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করা তাঁর সরকারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত।
তবে এই প্রাপ্তির পাশাপাশি সুশাসন, মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশে-বিদেশে তৈরি হয়েছিল ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভ। সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অনমনীয়তা এবং একচ্ছত্র ক্ষমতার চর্চা সার্বিক রাজনৈতিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। একজন নেত্রী হিসেবে তাঁর দৃঢ়তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা যেমন দলকে একাধিকবার ক্ষমতায় এনেছে, তেমনি অতিরিক্ত অনমনীয়তার মূল্যও দিতে হয়েছে রাজনীতিতে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি দীর্ঘ ও নাটকীয় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে। এই নাটকীয় বিদায় তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে যুক্ত করেছে এক নতুন মাত্রা।
দেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ইতিহাস বহু পুরোনো। উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাওয়া কোনো দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কোনো দল বা নেতার অবস্থান এক দিনে যেমন তৈরি হয় না, তেমনি রাতারাতি মুছেও যায় না। যেকোনো রাজনৈতিক শক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে গঠনমূলক আত্মসমালোচনা, পরিশুদ্ধতা এবং জনগণের আস্থা পুনর্বহালের ক্ষমতার ওপর। শেখ হাসিনার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সাফল্য, ব্যর্থতা, আলো ও অন্ধকারের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সময়ের পরিক্রমায় ইতিহাসই নিরেপেক্ষভাবে সম্পন্ন করবে।









