জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

রাজবাড়ীতে পুলিশের সামনে নারী ব্যবসায়ীকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ

রাজবাড়ী শহরের প্রধান কাপড় বাজার এলাকায় ব্যবসায়িক বিরোধকে কেন্দ্র করে নারী ব্যবসায়ীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। গত শনিবার দুপুরের এ ঘটনার পর ধারণ করা একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে এক নারীকে কয়েকজন ব্যক্তির ঘেরাওয়ের মধ্যে যেতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তাঁকে লাথি ও থাপ্পড় মারার দৃশ্যও দেখা গেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে ভিডিওটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট এবং সেখানে থাকা সব ব্যক্তির পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগকারী নারী ব্যবসায়ী জাকিয়া সুলতানা। তিনি রাজবাড়ী শহরের বড়পুল এলাকার বাসিন্দা এবং কাদেরিয়া মার্কেটের তৃতীয় তলায় ‘আস্থা পোশাক শিল্প’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। জাকিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে তিনি ওই মার্কেটে ব্যবসা করে আসছেন।

জাকিয়ার দাবি, কয়েক মাস আগে তাঁর প্রতিষ্ঠানে শাহনাজ পারভীন নামের এক নারী কর্মী হিসেবে যোগ দেন। পরে শাহনাজ আর কাজ করবেন না বলে জানালে তাঁর পাওনা বেতন নিয়ে দুজনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। জাকিয়া তাঁকে কাজ শেষ করে নির্ধারিত সময়ে বেতন নেওয়ার কথা বলেছিলেন। গত ২২ আগস্ট বেতন পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মধ্যে আবারও কথা-কাটাকাটি হয়।

জাকিয়ার অভিযোগ, পরদিন রাতে শাহনাজ পারভীন কয়েকজন বহিরাগতকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠানে যান। সেখানে এক দিনের মধ্যে বেতন পরিশোধের দাবি জানানো হয়। এ নিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একপর্যায়ে তাঁর প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয় বলে দাবি করেন জাকিয়া। পরে ঘটনার প্রতিকার চেয়ে তিনি মার্কেট কমিটির কাছে অভিযোগ করেন।

জাকিয়া জানান, মার্কেট কমিটির পক্ষ থেকে বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

রাজবাড়ী বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক বেনজির আহমেদ বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি কাপড় বাজারে যান। সেখানে উভয় পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে দুই পক্ষকে নিয়ে বসে বিষয়টির সমাধান করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

তবে জাকিয়ার দাবি, এরপরও বিরোধের জেরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। গত শনিবার দুপুরে তাঁর প্রতিষ্ঠানে হামলার প্রতিবাদে তিনি মানববন্ধন ও মিছিল করেন। এ সময় কয়েকজন ব্যবসায়ী তাঁদের ওপর হামলা করেন বলে অভিযোগ তাঁর। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়।

জাকিয়ার অভিযোগ, পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে থানার দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও বহিরাগত ব্যক্তি তাঁর ওপর হামলা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন নারী পুলিশ সদস্যের সঙ্গে জাকিয়া হাঁটছেন। আশপাশে আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। তাঁদের পেছনে একদল ব্যক্তি বিক্ষোভ করছিলেন।

ভিডিওর দৃশ্যে দেখা যায়, একপর্যায়ে পাশ থেকে একজন যুবক জাকিয়াকে লাথি মারার চেষ্টা করেন। পরে অন্য পাশ থেকে আরেকজন ব্যক্তি তাঁকে লাথি মারেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একই সময়ে পেছন থেকে একজন ব্যক্তি তাঁর মুখে থাপ্পড় দেন বলেও ভিডিওতে দেখা যায়। ঘটনার সময় জাকিয়ার সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যদের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতেও দেখা যায়।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি সম্পূর্ণ ঘটনার রেকর্ড নয়। ভিডিওটি কোথা থেকে শুরু হয়েছে, এর আগে কী ঘটেছিল এবং পরে কী হয়েছে—এসব বিষয় ওই দৃশ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ফলে শুধু ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে ঘটনার সব পক্ষের দায় নির্ধারণ করাও সম্ভব নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে বিভ্রান্তিকর তথ্য

ভিডিও প্রকাশের পর ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। কিছু পোস্টে দাবি করা হয়, একজন নারী ভোক্তা অধিকার-সংক্রান্ত অভিযোগ করেছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর মার্কেটের লোকজন ওই নারীকে হামলা করেন।

আবার অন্য একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় ভিডিওটি প্রকাশ করে দাবি করা হয়, এতে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এসব দাবির সঙ্গে রাজবাড়ীর ঘটনার তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভিডিওতে থাকা নারী জাকিয়া সুলতানা একজন পোশাক ব্যবসায়ী এবং তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিরোধের সূত্র হিসেবে কর্মচারীর বেতনসংক্রান্ত বিষয়টি উঠে এসেছে। তাই ভিডিওটির সঙ্গে ভিন্ন ঘটনা বা ব্যক্তির পরিচয় জুড়ে দিয়ে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

থানায় এখনো লিখিত অভিযোগ হয়নি

ঘটনার পর জাকিয়া সুলতানা এখনো থানায় লিখিত অভিযোগ করেননি। তিনি জানান, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে বিষয়টি আনুষ্ঠানিক তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উত্তম কুমার ঘোষ জানিয়েছেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থানায় লিখিত অভিযোগ করেনি।

ফলে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং হামলার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়নি। একদিকে নারী ব্যবসায়ীর অভিযোগ, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও—দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিওর পূর্ণাঙ্গ ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে পুলিশের উপস্থিতিতে কোনো ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুত্ব বহন করে। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনার সঙ্গে অসত্য পরিচয় বা ভিন্ন প্রেক্ষাপট যুক্ত করে প্রচার করা হলে সেটিও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তাই তদন্ত বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া ভিডিওটির ভিত্তিতে কোনো পক্ষকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা থেকে বিরত থাকা জরুরি।

Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক । জিলাইভ বাংলা

https://bn.glive24.com/

সর্বশেষ খবর