বার্ষিক দুই কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করা ব্যবসা ও কোম্পানিকে ন্যূনতম টার্নওভার কর থেকে অব্যাহতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুই কোটি টাকার বেশি টার্নওভার করা প্রতিষ্ঠানের জন্য ধাপে ধাপে করহার নির্ধারণের প্রস্তাবও করা হয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার করের চাপ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, বছরে সর্বোচ্চ দুই কোটি টাকা টার্নওভার করা ব্যবসা ও কোম্পানিকে আর ন্যূনতম টার্নওভার কর দিতে হবে না। দুই কোটি টাকার বেশি থেকে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের ক্ষেত্রে করহার নির্ধারণ করা হয়েছে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। তিন কোটি টাকার বেশি থেকে চার কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভারে প্রযোজ্য হবে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ কর। আর চার কোটি টাকার বেশি টার্নওভার করা ব্যবসা ও কোম্পানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান এক শতাংশ ন্যূনতম টার্নওভার কর বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ প্রস্তাবের সারসংক্ষেপ ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রীর অনুমোদন পেয়েছে। পরবর্তী আইনগত যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো ব্যবসা লাভে থাকুক কিংবা লোকসানে, নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী টার্নওভারের ওপর ন্যূনতম কর দিতে হয়। ফলে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিক্রির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হলেও প্রকৃত মুনাফার হার কম, তাদের ওপর করের চাপ বাড়ে। ব্যবসায়ী মহলের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, মুনাফার পরিবর্তে শুধু বিক্রির পরিমাণকে ভিত্তি করে ন্যূনতম কর আরোপ করায় অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক চাপে পড়ে।
বিশেষ করে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, পরিচালন ব্যয়, ঋণের সুদ, ভাড়া, পরিবহন ব্যয় এবং অন্যান্য খরচ বেড়ে গেলে ব্যবসার প্রকৃত লাভ কমে যায়। এমন পরিস্থিতিতে টার্নওভারের ওপর নির্দিষ্ট হারে কর দিতে হলে কম মুনাফার ব্যবসার নগদ প্রবাহে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। নতুন প্রস্তাবের মাধ্যমে সেই চাপ অন্তত ছোট ও তুলনামূলক কম টার্নওভার করা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভ্যাট কনসালট্যান্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি হাসানুল ইসলাম টিপু এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ কঠিন হয়ে ওঠার সময়ে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ন্যূনতম টার্নওভার কর থেকে অব্যাহতি স্বস্তির খবর হতে পারে।
অন্যদিকে এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক মনে করেন, শুধু করহার কমালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আয় ও মুনাফার ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা উচিত। সে কারণে ন্যূনতম টার্নওভার কর পুরোপুরি বাতিল করে প্রকৃত মুনাফাভিত্তিক করব্যবস্থার দিকে এগোনোর প্রয়োজন রয়েছে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদও বিদ্যমান ব্যবস্থা থেকে সরে আসার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, প্রস্তাবিত করছাড় ছোট ব্যবসার জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও কম মুনাফা বা লোকসানে থাকা বড় ব্যবসাগুলোর সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না।
প্রস্তাবিত করকাঠামো নিয়ে একটি উদ্বেগও রয়েছে। দুই কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভারে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হলে কিছু ব্যবসা নির্ধারিত সীমার নিচে থাকার জন্য প্রকৃত বিক্রির চেয়ে কম টার্নওভার দেখানোর চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। তাই করছাড়ের সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকৃত লেনদেন ও হিসাব যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা রাখা জরুরি হবে।
বর্তমান ব্যবস্থার প্রভাব বোঝাতে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দেওয়া কয়েকটি উদাহরণ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন, বছরে ৫০ লাখ টাকা বিক্রি এবং পাঁচ শতাংশ মুনাফা করা একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মুনাফা হয় দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু এক শতাংশ টার্নওভার করের হিসাবে তাকে দিতে হয় ৫০ হাজার টাকা কর। আবার এক কোটি টাকা বিক্রি ও পাঁচ লাখ টাকা মুনাফা করা একটি ব্যবসার ক্ষেত্রে নিয়মিত আয়কর তুলনামূলক কম হলেও টার্নওভারের এক শতাংশ হিসাবে করের পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ টাকা।
নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করা প্রতিষ্ঠানগুলো এ ন্যূনতম কর থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাবে। আর উচ্চ টার্নওভারের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ধাপে ধাপে করহার নির্ধারণ হওয়ায় বর্তমান একক হারের তুলনায় ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের অনেক ব্যবসার করের বোঝা কমতে পারে।
এখন আইনগত যাচাই-বাছাই শেষে প্রস্তাবটি কীভাবে চূড়ান্ত হয়, করহার ও সীমায় কোনো পরিবর্তন আসে কি না এবং কবে থেকে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে—সেদিকেই নজর ব্যবসায়ী ও করসংশ্লিষ্ট মহলের।









