ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে বিমান চলাচলের জ্বালানি জেট ফুয়েলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে এই জ্বালানির দাম যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে প্রতি ব্যারেল ১৮১ ডলারে পৌঁছেছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বিমান সংস্থাগুলো বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে এবং বিকল্প জ্বালানির উৎস নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপে জেট ফুয়েলের মজুত ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ) নির্ধারিত সংকটকালীন সীমার নিচে মজুত নেমে যেতে পারে বলে গোল্ডম্যান স্যাকস সতর্ক করেছে। একই সঙ্গে বিমান চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন দেশে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জার্মানির বিমান সংস্থা লুফথানসা আগামী অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার ফ্লাইট বাতিল করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান এয়ারলাইনস ও ডেলটার মতো বড় সংস্থাগুলো অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ের কারণে কোটি কোটি ডলারের আর্থিক চাপে পড়েছে। অন্যদিকে সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় স্পিরিট এয়ারলাইনস দেউলিয়া হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত বিকল্প জ্বালানি ‘সাসটেইনেবল অ্যাভিয়েশন ফুয়েল’ (এসএএফ) আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি মূলত ব্যবহৃত রান্নার তেল, কৃষি বর্জ্য এবং কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। বর্তমানে ব্যবহৃত এসএএফ-এর বড় অংশই রান্নার তেল থেকে উৎপাদিত হলেও এর সীমিত সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী রান্নার তেল থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ২০ মিলিয়ন টন জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব, যা ২০৫০ সালের জন্য নির্ধারিত ২৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন টনের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।
রান্নার তেলের বাইরে আরেকটি প্রযুক্তি হিসেবে ‘ই-এসএএফ’ বা কৃত্রিম জেট ফুয়েল নিয়ে গবেষণা চলছে। এতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পানি থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদন করা হয় এবং পরে কার্বনের সঙ্গে মিশিয়ে কৃত্রিম কেরোসিন তৈরি করা হয়। তাত্ত্বিকভাবে এর উৎপাদন সীমাহীন হলেও বর্তমানে এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
গ্রিন ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউটের মাহেশ রায় জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি জ্বালানি নিরাপত্তার ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এতদিন এসএএফ মূলত পরিবেশগত সমাধান হিসেবে বিবেচিত হলেও যুদ্ধ পরিস্থিতি ও সরবরাহ সংকটের কারণে এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা ও জ্বালানি স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। যেসব বিমান সংস্থা আগেই এসএএফ সরবরাহ চুক্তি করেছিল, তারা বর্তমানে তুলনামূলকভাবে সরবরাহ ঝুঁকি থেকে কিছুটা সুরক্ষিত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব বিকল্প জ্বালানির পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে আরও চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশগত নীতিমালা কঠোর হওয়া এবং জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০৩৫ সালের মধ্যে বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় প্রায় চারগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত যাত্রী ভাড়াতেও পড়বে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে যে, খনিজ তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিমান শিল্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে রান্নার তেলভিত্তিক এসএএফ এবং ই-ফুয়েলের মতো প্রযুক্তি এখন শুধু পরিবেশগত বিকল্প নয়, বরং বৈশ্বিক বিমান চলাচল সচল রাখার কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
