,

‘যা ভি খ লিয়া তেরা’ গানের সুরে স্মরণে নূরজাহান

‘যা ভিখ লিয়া তেরা, ওহি মুঝে কবুল হ্যায়’—একটি গানের পঙ্‌ক্তি, অথচ এর ভেতরেই যেন ধরা আছে নূরজাহানের কণ্ঠের সেই গভীর আবেগ, যা কয়েক প্রজন্মের শ্রোতাকে স্পর্শ করেছে। উপমহাদেশের সংগীত ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় গায়িকা নন; তিনি ছিলেন এক সময়ের সাংস্কৃতিক প্রতীক। ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’ নামে পরিচিত এই শিল্পী নিজের স্বতন্ত্র গায়কী, শক্তিশালী কণ্ঠ এবং আবেগঘন পরিবেশনের মাধ্যমে সংগীতজগতে তৈরি করেছিলেন স্থায়ী এক আসন।

নূরজাহানের প্রকৃত নাম আল্লাহ রাখি ওয়াসাই। ১৯২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের কাসুরে তাঁর জন্ম। বাবা ইমদাদ আলী এবং মা ফতেহ বিবির ১১ সন্তানের পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি। পরিবারে সংগীতের পরিবেশ ছিল, আর সেই আবহেই ছোট বয়স থেকে তাঁর প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। শিশুকালেই গান ও অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শিল্পী হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল শিশুশিল্পী হিসেবে। অভিনয়ের পাশাপাশি গানও করতেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সংগীতই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান পরিচয়। ব্রিটিশ ভারতের চলচ্চিত্রজগৎ থেকে শুরু করে পাকিস্তানের সংগীতাঙ্গন—দুই ভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন বিস্তৃত হয় ছয় দশকেরও বেশি সময়।

নূরজাহানের গায়কীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর বৈচিত্র্য। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রভাব তাঁর পরিবেশনে যেমন স্পষ্ট ছিল, তেমনি গজল, চলচ্চিত্রের গান, লোকগীতি ও দেশাত্মবোধক গানেও তিনি নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেছিলেন। উর্দু, পাঞ্জাবি, পশতু, সিন্ধি ও ফারসিসহ বিভিন্ন ভাষায় তিনি গান রেকর্ড করেন। তাঁর গানের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে আলাদা হিসাব পাওয়া গেলেও, বিপুল রেকর্ডভাণ্ডার তাঁর দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ শিল্পীজীবনেরই সাক্ষ্য বহন করে।

চলচ্চিত্রের সঙ্গে নূরজাহানের সম্পর্ক ছিল আরও বিস্তৃত। তিনি অভিনয় করেছেন, গান গেয়েছেন এবং চলচ্চিত্র পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের প্রাথমিক পর্যায়ের নারী পরিচালকদের মধ্যে তাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ পর্দার সামনে শিল্পী হিসেবে যেমন তাঁর উপস্থিতি ছিল, তেমনি পর্দার পেছনের সৃজনশীল কাজেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন।

পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের সংগীতে তাঁর দ্বৈতকণ্ঠের গানও বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। গায়ক আহমেদ রুশদির সঙ্গে তাঁর পরিবেশিত গানগুলো শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল। নূরজাহানের কণ্ঠের শক্তি ও আবেগ চলচ্চিত্রের গল্প, চরিত্র ও দৃশ্যের অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তুলত।

শিল্পী হিসেবে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিও আসে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। ১৯৬৫ সালে অভিনয় ও সংগীতে অবদানের জন্য তিনি পাকিস্তানের ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ পুরস্কার লাভ করেন। একই বছরের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁর গাওয়া দেশাত্মবোধক গান পাকিস্তানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সেই সময় তাঁর কণ্ঠ দেশাত্মবোধক সংগীতের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত হয়ে যায়।

পরবর্তী সময়ে নূরজাহান তামঘা-ই-ইমতিয়াজ ও সিতারা-ই-ইমতিয়াজসহ আরও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা অর্জন করেন। তাঁর দীর্ঘ শিল্পীজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন পর্যায়ে আজীবন সম্মাননাও দেওয়া হয় তাঁকে। এসব পুরস্কার তাঁর শিল্পীসত্তার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির পাশাপাশি পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তাঁর অবস্থানকেও তুলে ধরে।

তবে নূরজাহানের জীবন কেবল সাফল্য আর খ্যাতিতে ভরা ছিল না। ব্যক্তিজীবনেও তাঁকে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ১৯৪২ সালে তিনি বিয়ে করেন শওকত হোসেন রিজভীকে। তাঁদের সংসারে তিন সন্তানের জন্ম হয়। তাঁদের একজন, জিল-ই-হুমা, পরবর্তীতে সংগীতশিল্পী হিসেবে মায়ের পথ অনুসরণ করেন। ১৯৫৩ সালে নূরজাহান ও শওকত হোসেন রিজভীর বিবাহবিচ্ছেদ হয়।

এরপর ১৯৫৯ সালে তিনি বিয়ে করেন এজাজ দারানিকে। তাঁদের সংসারেও তিন সন্তানের জন্ম হয়। তবে সেই সম্পর্কও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; ১৯৭০ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। ব্যক্তিজীবনের এসব পরিবর্তন তাঁর পেশাগত পথচলাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। গান ও অভিনয়ের জগতে তিনি নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিলেন।

নূরজাহানের গানে মানুষের জীবনের নানা অনুভূতি জায়গা পেয়েছে। প্রেম, অপেক্ষা, বিরহ, আনন্দ কিংবা বিষাদ—প্রতিটি আবেগ তিনি কণ্ঠে এমনভাবে ধারণ করতেন, যেন গানটি তাঁর নিজের জীবনের কোনো গল্প। তাঁর গায়কীতে ছিল শক্তি, আবার ছিল কোমলতা। একটি উচ্চারণও কখনো কখনো পুরো গানের আবহ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত।

এই কারণেই তাঁর জনপ্রিয়তা কেবল একটি নির্দিষ্ট সময় বা প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পুরোনো রেডিও সম্প্রচার থেকে চলচ্চিত্রের গান, গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমে—নূরজাহানের কণ্ঠ বারবার নতুন শ্রোতার কাছে ফিরে এসেছে। সংগীতের মাধ্যম বদলেছে, শ্রোতার অভ্যাস বদলেছে, কিন্তু তাঁর কণ্ঠের আবেদন হারিয়ে যায়নি।

২০০০ সালের ২৩ ডিসেম্বর প্রয়াত হন মালিকা-ই-তারান্নুম নূরজাহান। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতজগৎ হারায় এমন এক শিল্পীকে, যাঁর কর্মজীবন একাধিক প্রজন্ম ও দুটি রাষ্ট্রীয়-সাংস্কৃতিক পর্বের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

তবে শিল্পীর মৃত্যু তাঁর সৃষ্টির সমাপ্তি নয়। নূরজাহানের ক্ষেত্রেও সেটিই সত্যি হয়েছে। তাঁর রেকর্ড করা গান আজও শোনা হয়, তাঁর গায়কী নিয়ে আলোচনা হয়, নতুন প্রজন্ম তাঁর কণ্ঠ আবিষ্কার করে। পুরোনো দিনের শ্রোতাদের কাছে তাঁর গান যেমন স্মৃতির অংশ, নতুন শ্রোতাদের কাছেও তা দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

নূরজাহান ছিলেন একই সঙ্গে গায়িকা, অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। কিন্তু এসব পরিচয়ের বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন এমন এক কণ্ঠের অধিকারী, যা মানুষের আবেগকে সরাসরি স্পর্শ করতে পারত।

২০০০ সালে তাঁর কণ্ঠ থেমেছে। কিন্তু সেই কণ্ঠে ধারণ করা সুর থামেনি। সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে আজও তাঁর গান ফিরে আসে, আর প্রতিবারই মনে করিয়ে দেয়—কিছু শিল্পী চলে গেলেও তাঁদের সৃষ্টির সঙ্গে তাঁদের উপস্থিতি থেকে যায়।

মালিকা-ই-তারান্নুম নূরজাহান তেমনই এক অমর নাম। দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতের ইতিহাসে তাঁর কণ্ঠ তাই শুধু একটি স্মৃতি নয়, এক দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।