শহীদ চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বির জীবন ছিল মানুষের সেবায় নিবেদিত। চিকিৎসক হিসেবে তিনি অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, রোগীর পরিচয়, ধর্ম কিংবা সামাজিক অবস্থানকে কখনো মানবিক দায়িত্বের পথে বাধা হতে দেননি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রহরে সেই মানবিক চিকিৎসকই পরিণত হন ঘাতকদের শিকারে। তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো আজও বয়ে বেড়ায় এক গভীর মানবিক বার্তা—‘ভুলে যেয়ো না, ওরাও মানুষ।’
ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি ১৯৩২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ছিলেন এবং ক্লিনিক্যাল মেডিসিন ও হৃদরোগ চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চিকিৎসাকে তিনি কেবল পেশা হিসেবে দেখেননি; মানুষের জীবন রক্ষা ও অসুস্থের পাশে দাঁড়ানোকে নিজের কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর। মুক্তিযুদ্ধ তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের পরাজয় যখন আসন্ন, তখনও ঢাকায় আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা কাটেনি। শহরের বিভিন্ন এলাকায় চলছিল হত্যাকাণ্ড ও অপহরণ। সেই সময় বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের পরিকল্পিতভাবে তুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছিল।
১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর পরপর দুই রাতে ডা. ফজলে রাব্বির স্ত্রী জাহানারা রাব্বি একটি অস্বাভাবিক স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে তিনি সাদা সুতির চাদর পরা অবস্থায় তিন সন্তানকে নিয়ে এমন একটি স্থানে যাচ্ছেন, যেখানে চারটি কালো থামের মাঝখানে সাদা চাদরে ঘেরা কিছু একটা দেখা যাচ্ছে।
১৫ ডিসেম্বর সকালে স্বামীকে সেই স্বপ্নের কথা জানান তিনি। ফজলে রাব্বি শান্তভাবে জবাব দেন, ‘তুমি বোধহয় আমার কবর দেখেছ।’
স্বামীর এমন কথায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন জাহানারা রাব্বি। তিনি পরিচিত অধ্যাপকদের বাড়িতে ফোন করে পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার এবং প্রয়োজনে নিরাপদ কোথাও চলে যাওয়ার কথা বলেন। ফজলে রাব্বিও কয়েকজনকে ফোন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু যুদ্ধের শেষ মুহূর্তের অস্থিরতায় অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সেদিন ঢাকার পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। আকাশে যুদ্ধবিমান, চারদিকে গোলাবর্ষণ ও বিস্ফোরণের শব্দ। এর মধ্যেই সকাল ১০টার দিকে অল্প সময়ের জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়।
এই সুযোগে ফজলে রাব্বি পুরান ঢাকায় এক রোগীকে দেখতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। রোগীটি ছিলেন অবাঙালি। যুদ্ধের সেই বিভক্ত ও সহিংস সময়ে এমন সিদ্ধান্ত পরিবারের সদস্যদের স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন করে তোলে। স্ত্রী তাঁকে যেতে নিষেধ করেন।
কিন্তু ফজলে রাব্বির উত্তর ছিল, ‘ভুলে যেয়ো না, ওরাও মানুষ।’
এই ছোট্ট বাক্যটি তাঁর চিকিৎসকসত্তা ও মানবিক দর্শনের গভীর পরিচয় বহন করে। যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যেও একজন অসুস্থ মানুষের পরিচয় তাঁর কাছে আগে ছিল একজন মানুষ হিসেবে। তিনি রোগীকে দেখে কারফিউ শুরু হওয়ার আগেই বাড়ি ফিরে আসেন।
বাড়িতে ফিরে দুপুরের খাবার খান। খাবার ছিল আগের দিনের তরকারি। কিন্তু সেই খাবার খেতে খেতেই তিনি বলেছিলেন, ‘আজকের দিনে এত ভালো খাবার খেলাম।’ কথাটির মধ্যে কোনো বিশেষ তাৎপর্য তিনি বুঝিয়ে বলেছিলেন কি না, তা জানা যায় না। তবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের কারণে তাঁর পরিবারের কাছে বাক্যটি হয়ে ওঠে গভীর বেদনার স্মৃতি।
জাহানারা রাব্বি সেদিন বিকেলেই পরিবার নিয়ে অন্যত্র চলে যেতে চেয়েছিলেন। ফজলে রাব্বি তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, দুপুরটা একটু গড়িয়ে নিই।’
কিন্তু সেই অপেক্ষার সময় খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি।
কিছুক্ষণ পর বাবুর্চি ছুটে এসে জানান, বাড়িটি ঘিরে ফেলা হয়েছে। বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল একটি কাদালেপা মাইক্রোবাস। আশপাশে ছিল রাজাকার, আলবদর ও পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ফজলে রাব্বি স্ত্রীকে নিচু স্বরে জানান, তাঁকে নিতে আসা হয়েছে।
তিনি দারোয়ানকে গেট খুলে দিতে বলেন। এরপর ঘাতকদের সঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। সময় তখন বিকেল ৪টা।
সেই বেরিয়ে যাওয়া পরিবারের জন্য পরিণত হয় দীর্ঘ ও যন্ত্রণাময় অপেক্ষায়। ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। স্বাধীনতার ঠিক আগে সংঘটিত বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের শিকার বহু মানুষের মতোই ফজলে রাব্বির জীবনও থেমে যায় নির্মমভাবে।
তবে তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ থেমে যায়নি।
ডা. ফজলে রাব্বির জীবনের শেষ দিনের সবচেয়ে স্মরণীয় বাক্য—‘ভুলে যেয়ো না, ওরাও মানুষ’—শুধু একটি পারিবারিক স্মৃতি নয়। এটি এমন এক সময়ের দলিল, যখন যুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভয়াবহতার মধ্যেও একজন চিকিৎসক তাঁর রোগীর মানবিক পরিচয়কে সবার আগে স্থান দিয়েছিলেন।
চিকিৎসক হিসেবে তিনি মানুষের জীবন বাঁচাতে প্রেসক্রিপশন লিখেছেন। অথচ ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতায় ঘাতকেরা তাঁর জন্য লিখেছিল মৃত্যুর পরোয়ানা। তাঁর জীবন কেড়ে নেওয়া গেলেও মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ও মানবিকতার শিক্ষা মুছে ফেলা যায়নি।
আজ তাঁর জন্মদিনে ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বিকে স্মরণ করার অর্থ কেবল একজন শহীদ চিকিৎসকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পরিচয়ের আগে তার মানবিক পরিচয়কে স্থান দেওয়াই চিকিৎসাসেবার অন্যতম মৌলিক আদর্শ।
ফজলে রাব্বির হাতে লেখা চিকিৎসার প্রেসক্রিপশন হয়তো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। কিন্তু মানুষের প্রতি মমতা, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার যে শিক্ষা তিনি রেখে গেছেন, সেটিই তাঁর সবচেয়ে স্থায়ী উত্তরাধিকার।
মানুষকে বাঁচানো ছিল তাঁর পেশা। মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর জীবনদর্শন। আর শেষ মুহূর্তেও তিনি সেই আদর্শ থেকে সরে যাননি।
শহীদ চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
‘ভুলে যেয়ো না—ওরাও মানুষ।’









