দুই বাংলার রূপালি পর্দার চিরসবুজ অভিনেত্রী জয়া আহসান মনে করেন, বর্তমান যুগে মানুষের সাথে প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে হাতের মুঠোয় থাকা মোবাইল ফোনটি। তাই মানসিক প্রশান্তি ও জীবনকে গভীরভাবে অনুভবের জন্য অপ্রয়োজনে প্রযুক্তির ব্যবহার কমিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি এক পডকাস্টে জয়া তাঁর ব্যক্তিগত জীবনদর্শন, অভিনয়ের কৌশল এবং সুস্থ জীবনযাপনের বিভিন্ন দিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। সেখানে তিনি তুলে ধরেন কেন আমাদের ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা প্রযুক্তি থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়া প্রয়োজন।
Table of Contents
মোবাইল ফোন বনাম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা
জয়া আহসানের মতে, একজন শিল্পীর জন্য সবচেয়ে বড় পাঠশালা হলো তাঁর চারপাশের সমাজ ও মানুষ। কিন্তু মোবাইল ফোনের নীল পর্দার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকার কারণে আমরা আমাদের চারপাশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সৌন্দর্য ও সংগ্রামগুলো দেখতে ভুলে যাচ্ছি। জয়া বলেন, “রাস্তায় চলার সময় আমাদের চোখ থাকে ফোনের পর্দায়। ফলে পাশের গাছটি কীভাবে হাওয়ায় দুলছে, একজন রিকশাচালক রোদে পুড়ে কীভাবে জীবনসংগ্রাম করছেন, কিংবা ট্রাফিক জ্যামের বিচিত্র চরিত্রগুলো আমাদের অজানাই থেকে যাচ্ছে।” তিনি মনে করেন, এই পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেললে একজন অভিনেতার সৃজনশীলতাও ভোঁতা হয়ে যায়।
জয়া আহসানের চিন্তাধারা ও যাপিত জীবনের নির্যাস:
| আলোচনার মূল বিষয় | জয়া আহসানের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতা |
| মোবাইলের প্রভাব | এটি মানুষকে চারপাশের বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। |
| শুটিং সেটের শৃঙ্খলা | চরিত্রের গভীরে ডুব দিতে জয়া সেটে ফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকেন। |
| পর্যবেক্ষণ থেরাপি | সাধারণ মানুষের জীবন ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা একজন শিল্পীর বড় শিক্ষা। |
| মানসিক স্বাস্থ্য | ভোরের পাখির ডাক ও বাতাসের ছোঁয়া মানসিক সুস্থতার মহৌষধ। |
| নতুন চলচ্চিত্র | আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গে মুক্তি পাচ্ছে জয়ার নতুন সিনেমা ‘ওসিডি’। |
| ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ | ফিল্মফেয়ার জয়, প্লাস্টিক সার্জারি গুঞ্জন ও কলকাতার কাজের স্মৃতিচারণ। |
অভিনয়ের নেপথ্যে ইন্দ্রিয় সক্রিয় রাখার গুরুত্ব
জয়া আহসান জানান, তিনি তাঁর অভিনয় জীবনের শুরু থেকেই একটি বিশেষ নিয়ম মেনে চলেন—তা হলো সেটে বা কাজের সময় ফোনের ব্যবহার থেকে দূরে থাকা। তাঁর মতে, অভিনয় কেবল সংলাপ বলা নয়, বরং এটি অনুভবের বিষয়। যখন একজন শিল্পী অন্য কাউকে স্পর্শ করেন বা চোখের দিকে তাকান, তখন সেই সংবেদনশীলতার মাধ্যমেই দর্শকের হৃদয়ে অনুভূতি পৌঁছায়। ঘ্রাণ নেওয়া, শোনা এবং খুঁটিয়ে দেখার মতো পঞ্চেন্দ্রিয়কে সজাগ রাখা শিল্পীদের জন্য এক ধরণের ‘থেরাপি’। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের এই সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে ভোঁতা করে দিচ্ছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
প্রকৃতির সান্নিধ্যই অকৃত্রিম আরোগ্য
ব্যস্ত নাগরিক জীবনে আমাদের প্রত্যেকেরই কিছুটা সময় প্রকৃতির সাথে কাটানো উচিত বলে জয়া মনে করেন। সকালের পাখির কিচিরমিচির শব্দ কিংবা ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়া মানুষের মনের সব ক্লান্তি দূর করে দিতে পারে। এই অকৃত্রিম থেরাপি মোবাইল ফোনের কৃত্রিম বিনোদন থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। জয়া দর্শকদের পরামর্শ দেন, প্রতিদিন অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও যেন মানুষ ফোনটি দূরে সরিয়ে রেখে জানালার বাইরের জগতের দিকে তাকায়। এটি কেবল শিল্পীদের জন্য নয়, প্রতিটি মানুষের মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।
পডকাস্টের বিচিত্র আলাপ ও আসন্ন সিনেমা
পডকাস্টের দীর্ঘ আলোচনায় জয়া কেবল উপদেশেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি তাঁর ক্যারিয়ারের নানা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথাও শেয়ার করেছেন। কলকাতায় কাজ করার সময়কার মধুর স্মৃতি, ভারতের মর্যাদাপূর্ণ ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জেতার অনুভূতি এবং তাঁকে নিয়ে হওয়া বিভিন্ন ব্যক্তিগত গুঞ্জন—সব বিষয়েই তিনি ছিলেন সাবলীল। বিশেষ করে প্লাস্টিক সার্জারি নিয়ে যে আলোচনাগুলো নিয়মিত চলে, সে বিষয়েও তিনি তাঁর ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।
সবশেষে তাঁর ভক্তদের জন্য রয়েছে একটি সুখবর। আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গজুড়ে মুক্তি পাচ্ছে জয়া আহসানের নতুন চলচ্চিত্র ‘ওসিডি’ (OCD)। অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার বা একটি নির্দিষ্ট ধরণের মানসিক স্বাস্থ্য অবস্থাকে কেন্দ্র করে সিনেমার কাহিনী আবর্তিত হয়েছে, যা জয়ার গভীর চিন্তাধারারই একটি প্রতিফলন।
উপসংহার
জয়া আহসানের এই বক্তব্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা প্রযুক্তির দাস নই, বরং প্রযুক্তি আমাদের সেবক হওয়া উচিত। জীবনের প্রকৃত স্বাদ নিতে হলে মোবাইলের পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে বাস্তব পৃথিবীর রূপ উপভোগ করতে হবে। জয়ার এই ‘জীবনকে দেখার’ দর্শন আমাদের যান্ত্রিক নাগরিক জীবনে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করতে পারে।
