খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জানুয়ারি ২০২৬, ৭:৩৪ এএম

বাগেরহাট সদর উপজেলায় এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে সাবেকডাঙ্গা গ্রাম। ৯ মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশু সন্তানকে বালতির পানিতে চুবিয়ে হত্যার পর কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী (২২) নামে এক গৃহবধূ নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি, ২০২৬) দুপুরে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটে। নিহত স্বর্ণালী বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী এবং মৃত শিশু নাজিম হোসেন তাঁদের একমাত্র সন্তান।
Table of Contents
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, স্বর্ণালীর স্বামী জুয়েল হাসান সাদ্দাম গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত হয়ে যশোর কারাগারে বন্দি রয়েছেন। স্বামীর দীর্ঘদিনের কারাবাস এবং তাঁকে মুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় স্বর্ণালী চরম মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। প্রিয় মানুষকে কাছে না পাওয়া এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় তিনি মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। এই তীব্র হতাশাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে এমন ভয়ংকর ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান ও তথ্য:
| তথ্যের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য ও পরিচয় |
| নিহত মা | কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী (২২ বছর)। |
| নিহত শিশু | নাজিম হোসেন (৯ মাস)। |
| পিতার পরিচয় | জুয়েল হাসান সাদ্দাম (সভাপতি, সদর উপজেলা ছাত্রলীগ)। |
| ঘটনাস্থল | সাবেকডাঙ্গা গ্রাম, বাগেরহাট সদর উপজেলা। |
| হত্যার ধরণ | শিশুকে বালতির পানিতে চুবিয়ে শ্বাসরোধ। |
| আত্মহত্যার ধরণ | সিলিংয়ের সাথে গলায় রশি দিয়ে ফাঁস। |
| স্বামীর অবস্থা | বর্তমানে যশোর কারাগারে বন্দি। |
ঘটনার দিন দুপুরে সাদ্দামের বাড়িতে তাঁর মা ও বোন অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সেই সুযোগে স্বর্ণালী তাঁর ৯ মাসের সন্তান নাজিমকে ঘরের ভেতরে থাকা একটি পানির বালতিতে চুবিয়ে ধরেন। শিশুটি নিথর হয়ে যাওয়ার পর স্বর্ণালী ঘরের দরজা বন্ধ করে নিজে ফ্যানের সাথে ঝুলে পড়েন। পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজা ভেঙে মা ও ছেলের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে।
বাগেরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুম খান সংবাদমাধ্যমকে জানান, স্থানীয়দের দেওয়া খবরের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তিনি বলেন, “মরদেহ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি নিছক আত্মহত্যা ও সন্তান হত্যা বলে প্রতীয়মান হলেও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে আমরা মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করতে পারব।” পুলিশ আরও জানায়, এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং ঘটনার পেছনে অন্য কোনো পারিবারিক কলহ বা প্ররোচনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি বাগেরহাট জেলাজুড়ে শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরিবারের প্রধান ব্যক্তির অনুপস্থিতি কীভাবে একটি সাজানো সংসার ধ্বংস করে দিতে পারে, এটি তারই চরম এক উদাহরণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বর্ণালী যে মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই সময়ে সঠিক কাউন্সেলিং বা পারিবারিক সহায়তা পেলে হয়তো এই নিষ্পাপ শিশু ও মায়ের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতো।
নাজিম হোসেনের মতো এক অবুঝ শিশুর মৃত্যু এবং স্বর্ণালীর এই আত্মহনন কেবল একটি শোক সংবাদ নয়, বরং এটি আমাদের সমাজ ও পরিবারের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। মানসিক বিষণ্ণতাকে অবহেলা না করে প্রিয়জনদের সংকটে পাশে দাঁড়ানো কতটা জরুরি, তা এই ঘটনাটি পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়। একটি সম্ভাবনাময় জীবনের এমন করুণ সমাপ্তি সত্যিই অপূরণীয় ক্ষতি।
মন্তব্য