অভিনন্দন একাত্তরের সুহৃদ ওয়াহিদা রেহমান শুভ জন্মদিন

১৯৩৬ সালের ১৪ মে ভারতের মাদ্রাজের চিঙ্গলেপুটে জন্মগ্রহণ করেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ওয়াহিদা রেহমান। পঞ্চাশ, ষাট এবং সত্তরের দশকজুড়ে তিনি ছিলেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম দাপুটে অভিনেত্রী। ভারতীয় চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রদের মধ্যে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।
রূপ, গুণ, অভিনয়শৈলী এবং ব্যক্তিত্ব—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছে এক “ক্ল্যাসিকাল বিউটি”। গুরু দত্তের সঙ্গে তাঁর অনবদ্য জুটি ভারতীয় সিনেমাকে উপহার দিয়েছিল কাগজ কে ফুল ও সাহেব বিবি আউর গোলাম-এর মতো কালজয়ী সৃষ্টি। পরবর্তীতে দেব আনন্দের সঙ্গে গাইড চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় আজও উপমহাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে এক অনির্বাণ আলো হয়ে জ্বলছে।
তবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ওয়াহিদা রেহমান কেবল একজন মহান অভিনেত্রী নন; তিনি একাত্তরের এক অকৃত্রিম বন্ধু, মানবতার এক উজ্জ্বল মুখ।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ভয়াবহ গণহত্যা শুরু করে, তখন ভারতের বহু বিবেকবান মানুষ বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যেই অন্যতম ছিলেন ওয়াহিদা রেহমান।
মুম্বইয়ে গঠিত “বাংলাদেশ এইড কমিটি”-র সহসভাপতি হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করেছিলেন। সাংবাদিক সলিল ঘোষ, সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বহু সচেতন মানুষের সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭১ সালের ৯ জুলাই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের একটি চিঠি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা নূরুল কাদির তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে, শুটিংয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও ওয়াহিদা রেহমান তাঁকে সস্নেহে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান। সকালের নাশতার টেবিলে বসে তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা, নির্যাতন আর গণহত্যার ভয়াবহ বিবরণ।
বাংলাদেশের অসহায় মানুষদের দুর্দশার কথা শুনে তিনি এতটাই আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন যে, সেদিন নিজের শুটিং পর্যন্ত বাতিল করে দেন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে আরও জানতে চান এবং দ্রুত সহায়তার উদ্যোগ নেন।
অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতায় তিনি মুম্বইয়ের শিল্পপতি, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, সংবাদপত্রের সম্পাদক এবং চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহায়তা আদায়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র জগতের বহু মানুষ বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। মানবতার এই ডাকে সাড়া দিয়ে ওয়াহিদা রেহমান হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের এক নির্ভরতার নাম।
বাংলাদেশ সরকার তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৩ সালে তাঁকে “Friends of Liberation War Honour” সম্মাননায় ভূষিত করে। আর ২০২৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান “দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার”-এ সম্মানিত করে।
পর্দার এই উজ্জ্বল নক্ষত্র প্রমাণ করেছিলেন—সত্যিকারের শিল্পীরা কেবল অভিনয়ে নয়, মানবিকতার দ্যুতিতেও মহান হয়ে ওঠেন।
বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তাই ওয়াহিদা রেহমান কেবল একজন অভিনেত্রী নন; তিনি একাত্তরের এক সুহৃদ, এক মানবিক আলোকবর্তিকা।
শুভ জন্মদিন, ওয়াহিদা রেহমান।
আপনার সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও শান্তিময় জীবনের জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা ও গভীর শ্রদ্ধা।