বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবলের সাম্প্রতিক ইতিহাসে যেদিনগুলো বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, গত রাত নিঃসন্দেহে তাদের একটি। ২২ বছর পর ভারতকে হারানোর মুহূর্তটি আসে নাটকীয়ভাবে—শেষ বাঁশি বাজতেই হামজা চৌধুরীর আবেগময় প্রতিক্রিয়া যেন পুরো দলের যন্ত্রণামুক্তি প্রকাশ করছিল। বহু ব্যর্থতা, স্বল্প ব্যবধানে হার, র্যাঙ্কিং ব্যবধান—সবকিছুকে জবাব দিয়ে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে স্বাগতিকরা। পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রক ছিলেন তরুণ তারকা শেখ মোরসালিন, যার গোলই ঠিক করে দেয় ম্যাচের ভাগ্য।
এই বাছাইপর্বে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল উত্থান–পতনে ভরপুর। ভারতের বিপক্ষে শিলংয়ে দারুণ খেলে ড্র করা, সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে আত্মঘাতী ভুলে হার, হংকংয়ের সঙ্গে দুই ম্যাচ থেকেই জয়ের সুযোগ হারানো—প্রতিটি ম্যাচেই দলের মনোবলে দাগ ফেলেছিল। সেই হতাশার পরেও হাল ছাড়েননি হামজা–শমিতরা। আর এই ম্যাচে যেন সমস্ত ক্ষোভ ও প্রমাণ করার তাগিদ উজাড় করে দেন খেলোয়াড়রা।
ম্যাচের শুরু থেকেই রক্ষণভিত্তিক কৌশল নেয় বাংলাদেশ। ভারত বামদিক দিয়ে আক্রমণে উঠছিল, তবে কাউন্টার অ্যাটাকে ছিল বাংলাদেশের পরিষ্কার পরিকল্পনা। ১১তম মিনিটে সেটিই ফল দেয়—মোরসালিনের পাস থেকে রাকিব হোসেন ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে দারুণ কাটব্যাক করে আবার মোরসালিনের দিকেই ফেরান। ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া নিশ্চিত করেন তিনি।
গোলের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে বাংলাদেশের হাতে। মাঝমাঠে সোহেল রানা ও শমিত সোমের সমন্বয় ভারতের আক্রমণ ভাঙতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। উইং দিয়ে একাধিক আক্রমণ সাজালেও সেগুলো থেকে দ্বিতীয় গোল আসেনি। এক পর্যায়ে তারিক কাজীর ইনজুরি ও মিতুল মারমার ভুলে বিপদ তৈরি হলেও রক্ষাকর্তা হিসেবে হাজির হন হামজা চৌধুরী—তার নিখুঁত হেড ক্লিয়ারে রক্ষা পায় বাংলাদেশ।
প্রথমার্ধে তপু–বিক্রমের সংঘর্ষ মাঠে উত্তেজনা বাড়ালেও কৌশলগতভাবে দৃঢ় থেকে খেলে যায় দল। দ্বিতীয়ার্ধে ভারত আরও চাপ সৃষ্টি করে, দুই সুযোগ পায়, কিন্তু নির্ণায়ক গোলের দেখা পায়নি। তপু বর্মণ, শাকিল আহাদ ও সাদ উদ্দিনের রক্ষণ–সমন্বয় শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে রুখে দেয়।
শেষ দশ মিনিটে বাংলাদেশও পাল্টা আক্রমণে গোলের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। শাকিলের একক দৌড় শেষে নেওয়া শট রুখে দেন ভারতীয় গোলরক্ষক গুরপ্রিত। অতিরিক্ত সময়েও ভারত গোল পেতে মরিয়া ছিল, কিন্তু রক্ষণভেদ করতে পারেনি।
অবশেষে ম্যাচের ফল দাঁড়ায় ১–০। স্টেডিয়াম তখন উত্তেজনা, আবেগ আর আনন্দে টলমল। যেন ২০০৩ সালের সেই বিজয়ের স্মৃতি ফিরে এসেছে। ২২ বছরের অপেক্ষার প্রাচীর ভেঙে নতুন ইতিহাস লিখলেন শেখ মোরসালিন ও তার সতীর্থরা—বাংলাদেশ ফুটবলের আত্মবিশ্বাসে নতুন যুগের সূচনা করে।
